
জেমস রাইট-এর সাক্ষাৎকার
ভাষান্তরঃ ঋতো আহমেদ
সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিতি
জন্ম: আমেরিকার ওহাইও রাজ্যের মার্টিন্স ফেরিতে ১৯২৭ সালের ১৩ ই ডিসেম্বর জন্মেছিলেন জেমস রাইট।
প্রথম যৌবন: ওহাইও-তে তাঁর শৈশব ভালো কাটেনি। পরে, ১৯৪৬ সালে তিনি ইউএস আর্মিতে অন্তর্ভুক্ত হন আর জাপান অকুপেশনে অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকে অব্যাহতি পেয়ে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন।
শিক্ষা:তিনি কেনিয়ন কলেজে পড়েছেন। ১৯৫২ সালে গ্রাজুয়েশন শেষে ১ বছর ভিয়েনায় কাটিয়ে তারপর ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন।
কবিতা: ১৯৫৬ সালে তাঁর ‘দ্য গ্রিন ওয়াল’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ইয়েল ইয়োঙ্গার পোয়েটস পুরস্কার পেয়ে কাব্য জগতের নজরে আসেন প্রথম। এরপর বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালে তাঁর কালেক্টেড পোয়েমস এর জন্য পান পুলিৎজার পুরস্কার। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দ্য গ্রিন ওয়াল
- সেইন্ট জুদাস
- দ্য ব্রাঞ্চ উইল নট ব্রেক
- শ্যাল উই গেদার এট দ্য রিভার
- কালেক্টেড পোয়েমস
- টু সিটিজেনস
- মোমেন্টস অব দ্য ইটালিয়ান সামার
- টু এ ব্লুজুমিং পিয়ার ট্রি
মৃত্যু: ১৯৮০ সালের ২৫শে মার্চ নিউ ইয়র্কে মাত্র ৫২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই কবি।
অন্যান্য: জেমস রাইটের ছেলে ফ্রাঞ্জ রাইটও আমেরিকার একজন বিখ্যাত কবি। তিনিও কবিতার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। এখনও পর্যন্ত পুলিৎজার ইতিহাসে পিতাপুত্রের এটি এক অভূতপূর্ব উদাহরণ হয়ে আছে।
সাক্ষাৎকার
[প্যারিস রিভিউ এর পক্ষে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন পিটার এ. স্টিট। ১৯৭৫ সালের সামার ৬২ সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়।]

সাক্ষাৎকারী : মি. রাইট, আপনি জন বেরিম্যানের সাথে মিনোসেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। প্রথমেই জানতে চাচ্ছি, কবি হিসেবে ওনার সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
জেমস রাইট : জন বেরিম্যান একজন মহৎ কবি। তাঁর কাজ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে বলে মনে হয় আমার। শুধুমাত্র তিনি একজন ভালো শিল্পী এইজন্য নয়, বরং তিনি তাঁর কবিতায় যেটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, হয়তো এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন না যদিও, বিষয়টি হচ্ছে কবিতা কেবলমাত্র একটি নির্মাণ বা সুন্দরভাবে গঠিত কিছু পংক্তি নয়, কবিতা বরং এমন কিছু যাকে বলা যায় চলমান সৃষ্টি। সে নিজে এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছায় যেখান থেকে নিজেই নিজেকে পুনঃসৃষ্টি করতে পারে। বেরিম্যান তাঁর সৃষ্টির বিকাশ কখনো বন্ধ করেন নি। তিনি দেখাতে চেয়েছেন মানুষের কল্পনায় কবিতা হচ্ছে বসন্তদিনের মতোই পুনঃসৃষ্টিময়। একই কারণে ড. উইলিয়ামসও একজন বড়ো কবি।
এইরকম একটা প্রশ্নে একবার টলস্টয়ও চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। শান্তিবাদী একটি দল একবার চিঠি লিখে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলো যদি তিনি জানাতেন ধর্মের সংজ্ঞা কি, যদি তিনি জানান, একটু ব্যাখ্যা করে তাদের বলেন যে, মানুষের যে ধর্ম-বিশ্বাস, এর সাথে নশ্বরতার সম্পর্ক কি, মানে হচ্ছে, বিশ্বাস অনুযায়ী যেভাবে সে চলে আর যেভাবে তার চলা উচিত। চিঠিটা পড়ে চিন্তায় ছিলেন কিছুদিন, তারপর, যদ্দূর মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন : “আমি শুধু নিজের কথাই বলতে পারি। যদি নিজের দিকে ফিরে তাকাই, দেখতে পাই, প্রতি বছর মানুষ নিজের জন্য বা অন্যের জন্য যা-ই করুক-না-কেন, বসন্তকাল সর্বদাই নিজেকে নবীন করে তোলে। এটা কোনো আধ্যাত্মিক মতবাদ নয়, প্রকৃত ঘটনা। প্রতিটি বসন্তে আমি খুব ভালো ভাবেই এটা বুঝতে পারি। বুঝতে পারি প্রতি বছর বসন্ত নতুন রূপে এসে হাজির হয় আর আমি হয়ে যাই এক বছরের পুরনো। যদি জানতে চাই: কি সম্পর্ক আছে, আমার এই বিশদ নশ্বর জীবনের সাথে প্রকৃতির ওই শক্তির যা নিজেকে চির নবীন করে তোলে? আমার মনে হয় সব মানুষের মধ্যে এই প্রশ্ন আছে। নিশ্চয়ই কেউ এড়াতে পারে না—মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। আর তার কাছে এর উত্তর হচ্ছে তার ধর্ম। যদি সে বলে আমার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই, তাহলে তার ধর্ম ধ্বংসবাদ। নশ্বরতায়, কি করা উচিৎ আমার? যদি জানতাম।” দারুণ একটা উত্তর ছিল এটা।
বড়ো কবি হওয়ার পেছনে ভাষার নৈপুণ্যগত দক্ষতা নিশ্চয়ই ছিল বেরিম্যানের। কিন্তু এর পাশাপাশি তিনি সবসময়ই বলে গেছেন কবিতা কেবল অলঙ্কার নয়, জীবনের সাথে, যেভাবে আমরা যাপন করি এই জীবন, তার সাথে, কবিতা গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে নিজেই।
সাক্ষাৎকারী : ‘কবি হওয়া’ ব্যাপারটা কি?
জেমস রাইট : আমি শুধু আমার কথা বলতে পারি। এক হোরেইশিয়ানের মতো, প্রাথমিক ভাবে নিজেকে শিল্পকার হিসেবে পরিচয় দিই আমি। আমার প্রিয় কবি এডওয়ার্ড থমাস, আর যাকে আমার গুরু বলে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই তিনি হোরেইস—হোরেইস, যিনি খুব নিঃখুঁতভাবে অমায়িক, হাস্যরসাত্মক কবিতা লিখতে পারতেন।
হ্যাঁ, অবশ্যই অন্য আরও কবিরা আছেন প্রিয় তালিকায়। উদাহরণ হিসেবে জ্যাক ফিনেগানের কথা বলা যায়। আমার বন্ধু জ্যাক ফিনেগান। একজন শিক্ষিত মার্জিত ভদ্রলোক। জ্যাক লোফাসের বার-এ মাঝেমধ্যে দেখা হয় আমাদের। আইরিশ কাব্যজগতে একটি ঐতিহ্য আছে, যে কারো কোনো প্রশ্নের উত্তর কবিতার নিজের মধ্যেই নিহিত থাকে। যেমন ধরুন, বার-এ উপস্থিত কোনো ব্যক্তিকে কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করলো: এই ডাইস নিয়ে কি করো তুমি? ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটি বললো:
ঈশ্বর ঐ ইহুদি মহিলাকে উঠিয়ে নাও,
রানী জেযেবেল, কুত্তি একটা
ঘার থেকে ঢলে দিয়েছে আঁচল
একেবারে স্তনবৃন্ত পর্যন্ত
জানালা গলে যেন তাকে টেনে আনা হয়েছে
জেরেনিয়ামদের মধ্যখানে, যেখানে
সে হাসছিল আর বিদ্রুপ ছুঁড়ে দিচ্ছিলো
তাঁর রঙিন চুল ফিটফাট করতে করতে—
রাজা জেহু গেলেন তার কাছে,আর
সে তাকে এক অভিনব সংকেত দিলো; কিন্তু
তিনি চাকার নিপুণ পাখি দিয়ে বললেন,
‘কে ভাঙতে চাও ঐ শিশিরাবৃত ঘার?’
এভাবেই জানালা থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয় ওকে;
পড়ে গেল সে লুসিফারের মতোই
ঘোড়ার খুরের নিচে, ব্যথা পেল খুব
আর জেযেবেল থেকে সরে গেল আলো।
ক্লোভারে বুনা নয় ওসব শস্য;
আহ্, আর খুঁজে পাওয়া যায় নি তাকে
রক্ষা করো ওই ধূসর হাড় ওই খরগোশ-পা মাইক
মধুর আওয়াজ শুনতে দাও আমায়;
চাঁদের আলোয় একবার যখন নাচছিলো
ওই দেহ, ভিজে গিয়েছিলো রাজকুমারী,
তাই শুধু দেব আমি তালি: যদিও তার ভূত পেছনে খালি
এখনও সুর আছে ঐ প্রাচীন দেহে।
এভাবেই বলতে হয়, “তুমি তোমার চরকায় তেল দাও, আমি আমার।” কবিতাটি আইরিশ কবি এফ আর হিগিন্সের “সঙ ফ দ্য ক্লেইটার-বোউন্স”।
আসলে, ভেবেছিলাম ওটা একটা সাহিত্য সভা মাত্র, আর হয়তোবা বিশ্বাস হবে না তোমার, কিন্তু ঈশ্বরের দিব্যি করে বলছি সত্যি কথা। আরেকদিন গেলাম লোফাসে, ফিনেগানের সাথে দেখা হলো। বললাম, “জ্যাক, কেমন আছো?” “ভালো আছি, প্রফেসর,” সে বললো, “তোমার খবর কি?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম—আর ঈশ্বরের নামে বলছি ভীষণ প্রাণময় উত্তর এলো। তাঁর তো জানার কথা নয় কী প্রশ্ন করবো আমি। বললাম, “জ্যাক, নিক্সনের চীন সফর নিয়ে কী ভাবছো তুমি?” আমার দিকে ফিরে চমৎকার ভাবে গাইলো:
সুন্দর শহর পিকিং
মেয়েরা সব চিচিং
সেখানে দেখি সে-কী
মিস মলি অং অং।
বড়ো চওড়া রাস্তায়
চালাচ্ছেন ঠেলাগাড়ি
গাইছে সেচুয়ান, পিকিং,
জীবন্ত লং ডং।
জীবন্ত লং ডং
জীবন্ত লং ডং
কাঁদছে সেচুয়ান, পিকিং,
জীবন্ত লং ডং।
অন-দ্যা-স্পট গানটি গাইলো সে। কী বলবো তাকে? জ্যাক, এখনই বাঁধলে গানটা? হ্যাঁ, উপস্থিত মুহূর্তেই গান বাঁধলো সে। আমি তার চাক্ষুষ প্রমাণ।
আরেকটি আইরিশ ট্র্যাডিশন বলছি। নিছক অহংকার আর বেঁচে থাকার সংকল্পের উপর যার ভিত্তি। এখানে কবিতা নিজেই জীবনকে প্রাণময় রাখতে পারে। যতক্ষণ সুর আছে—গাইতে পারবে যতোক্ষণ,—ততোক্ষণ যেকোনো কিছুই সইতে পারবে তুমি। রাফতেরী-কে চেনো? আঠারো শতকের এন্থোনি রাফতেরী, অন্ধ এবং শিক্ষিত, যার হাতে বীণা থাকতো সবসময়। একবার সে এক বার-এ দাঁড়িয়ে ছিল, আর এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, আহা কে ওই বেচারা অন্ধ, বীণা হাতে নত হয়ে কর্ণারে দাঁড়ানো বুড়োটা কে? রাফতেরী ঘুরে দাঁড়ালেন, বললেন: “আমি রাফতেরী, কবি, আশা ও ভালোবাসায় পূর্ণ, আলোহীন চোখ আমার, অক্লেশ নম্রতায়, হদয়ের আলোয় হেঁটে যাচ্ছি পশ্চিমে, যদিও পথের শেষে কিছুটা দুর্বল ও ক্লান্ত এখন, দ্যাখো আমায়, দেয়ালের দিকে আমার পিঠের দিকে তাকাও, শূন্য পকেটে গান করছি আমি।”
সাক্ষাৎকারী :কবি-জীবন কি কষ্টের? কী মনে করেন আপনি? এই যেমন বলছিলেন, দ্যাখো আমায়, দেয়ালের দিকে আমার পিঠের দিকে তাকাও, শূন্য পকেটে গান করছি আমি?
জেমস রাইট : হ্যাঁ, আপনি হয়তো জানেন, আমিও একজন অধ্যাপক। কাব্যগ্রন্থ লিখেছি কিছু, তবে আমি তো অধ্যাপক। আর আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, শিক্ষকতা এমনই এক শিল্প যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়। নিজেকে কবি বলছি না, আমি যা বোঝাতে চাইছি তাই বলছি। মানে হচ্ছে, ছাত্রদের সাথে যোগাযোগ, বই পাঠ করা, নিজের ভাবনা চিন্তা ওদের সাথে শেয়ার করা, আমাকে বেশি আনন্দ দেয়, আর আমার মনে হয় এটাই উচ্চতর শিল্প। সেইসব শিক্ষকদের কথা স্মরণ করুন যেমন যীশু, সক্রেটিস, সিদ্ধার্থ, মেইজতার একহার্দ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, হ্যাঁ।
সাক্ষাৎকারী : কবিতা কি এমন কোনো বিষয় যার থেকে মুক্তি নেই আপনার?
জেমস রাইট : হুম, আমাকে স্বীকার করতে হবে আমি এর থেকে পালাতে পারিনি, এমনকি বলতে গেলে আমার কাছে একরকম অভিশাপ মনে হয় একে। অনেক ভেবেছি। কেন আমি কাঠমিস্ত্রি হলাম না, কেনইবা হ্যান্ডিম্যান হলাম না?
সাক্ষাৎকারী : এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কবি জীবন মানে কি অনেক বেশি বিষয়ে সচেতন হওয়া বুঝায়?
জেমস রাইট : না, ওরকম এতো কিছু আমার মনে হয় না। অনেক বিষয়ে সচেতন আমি। কিন্তু কেবল যখন অদ্ভুত ঘটনা ঘটে আমার সাথে, সম্পূর্ণ বিস্ময়কর কোনো ঘটনা। আর যদিও বলছি হোরাইসিয়ান আমার আদর্শ, আমার ধারণা হোরাইসও এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। কখনো কখনো জীবনের এমন শক্তি আছে যেমন বসন্তকাল কিছু না জানিয়েই যে রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয় অকস্মাৎ, সত্যি ভিতিকর, ভীষণ আৎকে দেয় আমাকে। এরকম বেশ কয়েকবার হয়েছে আমার—যখন কোনো কবিতা লিখে শেষ করেছি প্রায় আর বাকি নেই তেমন, তখনই ঘটেছে।
সাক্ষাৎকারী : কোন কবিতার কথা বলছেন? মনে করে বলুন তো কোনটা?
জেমস রাইট : “ফাদার” নামে একটি কবিতা আছে। আর আছে “অ্যা ব্লেসিং”। যদি তুমি আমাকে প্রশ্ন করো, কীভাবে এলো ঐ কবিতা গুলো? আমার হয়তো বলতে হবে, আমি কীভাবে জানবো? কবি জীবন কখনো কখনো তোমাকে জীবনের করুণায় নিয়ে দাঁড় করাবে, আবার জীবন কিন্তু সবসময় করুণাময়ও নয়।
সাক্ষাৎকারী : আপনি কি কখনো সৃজনশীল লেখন পদ্ধতি শিখেছিলেন?
জেমস রাইট : একবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। কারণ, ক্লাসে গিয়ে শুধু বসে থাকতাম আর গল্প করতাম। আর যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো, আমার শিক্ষা কেমন চলছে, তেমন কিছু বলতে পারতাম না, কেবল ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করতাম কিছুটা। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এটি অকাজের। চাইলে চৌকসভাবেও করা যায়। যেমন আমরা জানি থিওডোর রোথেকের কথা। খুব ভালো শিক্ষক ছিলেন তিনি।
সাক্ষাৎকারী : তিনি আপনার শিক্ষক ছিলেন?
জেমস রাইট : হুম, চার বছর তিনি আমার বন্ধুও ছিলেন।
ওহ্ প্রিয় পিতা,
সমুদ্রের দাঁড়ানো জাহাজগুলোর
পা কি আছে, নিচে?
অবশ্যই আছে,
আরে বোকা,
নয়তো ওরা চলবে কি করে?
এইভাবে রোথেক ছাত্রদের দিকে পংক্তি ছুঁড়ে দিতেন।
সাক্ষাৎকারী :আপনাকে তিনি কী শিখিয়েছেন?
জেমস রাইট : শিল্প-নৈপুণ্য শিখিয়েছেন, আর তিনি, ব্যারিম্যান আর লোয়েলের মতো, সম্পূর্ণ সচেতন এক শিল্পকার ছিলেন। তিনি ভালো করেই বুঝতেন শিল্পের সাথে ওই রহস্যময় কল্পনার সম্পর্ক আসলে তেমন কিছুই না যা আমরা সচরাচর ভেবে থাকি। কেউ কেউ ভাবেন, সতর্ক আর সচেতন শিল্প-নৈপুণ্য আমাদের হৃদয়ের ভাবনাকে রুদ্ধ করে দেবে। আর রোথেক বুঝতে পারেন আসলে সতর্ক আর সচেতন শিল্প-নৈপুণ্য আমাদের হৃদয়ের ভাবনাকে মুক্ত করে, মুক্ত করে আমাদের কল্পনার শক্তিকে।
সাক্ষাৎকারী : আমরা জেনেছি আপনি সৃজনশীল সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। আসলে আনুষ্ঠানিক ভাবে ক’জন কবি যে সৃজনশীল সাহিত্যে পড়েছেন আমাদের তেমন জানা নেই। সত্যি কি শেখার কিছু আছে ওখানে, নাকি প্রয়োজনীয় শিক্ষা এখনও নিজে নিজেই শিখে নিতে হবে কবিদের?
জেমস রাইট : ব্যাপারটা বুঝে অতিক্রম করে যাওয়ার জন্যেই সৃজনশীল সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছি। তোমার কি মনে হয় না যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা তোমাকে নিজের থেকেই শিখে নিতে হবে? স্ট্যানলি ক্যুনিৎস একবার আমাকে বলেছিলেন: “তোমাকে নিজের গভীরে নামতে হবে, সত্যিকারের গভীরতায়, আর তারপর সেখান থেকে তোমার নিজস্ব পথ খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে। এটা অন্য কারো দেখানো পথ হলে হবে না। শুধুমাত্র তোমারই হতে হবে।”
আমি কি তোমাকে বলবো কেন এম.এ. করেছি কবিতার বই লিখে? আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। এম.এ. করেছিলাম যেন পরবর্তী সময়ে ডক্টরেট করতে পারি। এবং করেছিলামও। আমি ডিকেন্সকে নিয়ে লিখেছি। বলতে গেলে, একজন শিক্ষক হিসেবে আমার বিষয়, আমার প্রধান বিষয় ছিল ইংরেজি উপন্যাসের ইতিহাস।
সাক্ষাৎকারী : একজন কবি হয়ে?
জেমস রাইট : ওহো, বহু কবিতা আছে ওখানে। “আর সেই প্রাচীন ও পুরনো সেই করুণ ও প্রাচীন সেই করুণ ও ক্লান্ত আমি ফিরে যাই তোমার কাছে, নিথর পিতা আমার, নিথর উন্মাদ পিতা, নিথর উন্মাদ ও ভীতিকর পিতা আমার, যতক্ষণ না তাকে দেখতে পাই একদম কাছে, ..ছুটে যাই, আমার একমাত্র, তোমার কাছে।” ফিনেগান ওয়েক। আর একটা শুনতে চান? ত্রিস্ত্রাম শ্যাণ্ডি থেকে শোনাচ্ছি। ত্রিস্ত্রাম, সেই কথক, যিনি চাইছিলেন আপন জন্মস্থানে ফিরে যেতে। নবম পর্বের অষ্টম অধ্যায় শেষে তার মনে হয় এইবার তবে বলা যায় তার সেই জন্ম-রাতের গল্প, কিন্তু বলতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে তার কাকা তবি একবার বলেছিলেন সেই জন্মের রাতে তার বাবা, ওয়াল্টার শ্যাণ্ডি, আর তার মা ঝগড়া করছিলেন। ঝগড়া হচ্ছিলো কে কাজ করে আর কে সময়ে গা ভাসিয়ে চলে এইরকম কিছু নিয়ে। এইখানে হঠাৎ করে লরেন্স স্টার্ন নিজেই কথকের ভূমিকায় নামেন, ঝগড়ার মাঝখানে, তিনি এইভাবে এসে বলেন। উপন্যাসের ভেতর এ এক গদ্য:
এ নিয়ে তর্ক করবো না: সময় নষ্ট হয় দ্রুত: যে কটা অক্ষর আমি পড়েছি কতো দ্রুত-ই-না জীবন কেটে যায় এ-ই-তো লিখেছি; প্রতিটি দিন আর প্রহর, খুব মূল্যবান, প্রিয় জেনী! তোমার গলার ঐ হারের চেয়েও মূল্যবান হলো সময়, মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, ঝড়ো দিনের হালকা মেঘের মতো, আর ফিরে আসবে না—সবকিছু বিষণ্ণ করে তোলে—যখন তুমি শিল্প পেঁচিয়ে ধরছো—দ্যাখো! বিমর্ষ হয়ে গেছে; প্রতিবার বিদায় বেলায় যখন চুমু খাই তোমার হাতে, তারপর ফিরে ফিরে মনে পড়ে, এ তো আসলে অচিরেই ঘটতে যাওয়া আমাদের শাশ্বত মুক্তির শুরু—আমরা দু’জনই স্বর্গের আশীর্বাদ পুষ্ট! আর পুরো নবম অধ্যায় হলো: “একটা কানাকড়িও দিবো না—তবু, কেন যে সবার এতো উল্লাস।” একটু পরে আবার ঐ উপন্যাসের আরেক পাতায় এর ব্যঘাত ঘটিয়ে বলেন: “তুমি নিশ্চই জানো, জেনী কে? তাহলে এবার, নিজের কাজে মন দাও আর গল্পে ফিরে আসো।”
সাক্ষাৎকারী : কোন কোন কবির নাম বলতে চান যারা শুরুতে আপনাকে প্রভাবিত করেছিল? ওদের থেকে কী শিখতে পেরেছিলেন আপনি?
জেমস রাইট :
আচমকা বাতাস বয়ে এলো মৃদু,
বসন্ত এসেছে আবার;
সবুজে সবুজে কুঁড়িতে জীবন্ত হলো হাওথর্ন,
আর ব্যথার কুঁড়িতে আমার হৃদয়।
সমগ্র শীতে অসাড় আমার হৃদয়,
যেন মৃত এবং জমাটবদ্ধ পৃথিবী,
ভাবিনি বসন্ত আসবে আবার,
এমনকি জাগবে হৃদয় আমার।
তবু ভেঙে গেছে শীত, পৃথিবী জেগেছে
কেঁদে উঠছে ছোট্ট পাখিরা;
হাওথার্ন সীমায় ছড়িয়ে পড়েছে এর কুঁড়ি,
আর আমার হৃদয় ছড়িয়ে দিচ্ছে তার বেদনা।
বলতে পারেন কে লিখেছেন?
সাক্ষাৎকারী : রবিনসন?
জেমস রাইট : উঁহু, পারবেন না, পারবেন? রুপার্ট ব্রুক। মাত্র ষোল বছর বয়সেই তিনি খুব ভালো একজন লেখক হয়ে উঠেছিলেন। “পৃথিবীতে এই নীলাভ রাতের আকাশের নিচে অফুরন্ত চাপে..” আমরা তাকে যথার্থ সম্মান দিতে পারি নি, অথচ খুব ভালো লিখতেন তিনি। মারা গেছেন।
সাক্ষাৎকারী : গ্রিন ওয়ালের সাথে সংযুক্ত টীকায় আপনি রবিনসন আর ফ্রস্টের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
জেমস রাইট : হ্যাঁ, তখন কতো আর বয়স ছিল আমার। ঐ বইটা লিখেছি সাতাশ বছর বয়সে। আমার মনের মধ্যে কী চলছিল তখন বলছি তোমাকে। “সেইন্ট জুদাস” নামে একটা সনেট লিখেছি তখন। ওই সনেটে কৌশলগতভাবে দু’টো ব্যাপার করতে চেয়েছি: একই সাথে প্রকৃত পেত্রার্কীয় সনেট আর নাটকীয় স্বগতোক্তি লিখতে চেয়েছি। রবিনসনের কাছে এরকম ধারণা পেয়েছিলাম। তাঁর একটা সনেট আছে, “হাউ অন্নাদাল ওয়েন্ট আউট।” “ওয়েন্ট আউট” মানে কী জানো এখানে? আসলে, এটা হাসপাতালের ভাষা। মরে যাওয়া বুঝতে। তিনি এবং তিনি চলে গেলেন গতরাতে। অন্নাদাল চরিত্রটি আগে কোথাও লিখেছিলেন রবিনসন। কিন্তু এই সনেটটিতে ডাক্তার কথা বলছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই, নাটকীয় স্বগতোক্তিতে কথা বলছেন অন্য একজনের সাথে। এর মানে তুমি কী করছো, তুমি কান পেতে শুনছো, সেই কথোপকথনে একজন বলছে আর অন্যজন শুনছে। ডাক্তার ছিলেন জর্জ অন্নাদালের বন্ধু। জর্জ অন্নাদাল মদ্যপ ছিলেন। ভয়ানকভাবে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন তিনি। তাই ডাক্তার তাকে ইনজেকশন দিয়েছিলেন। এইটাই বুঝাতে চেয়ে “ইঞ্জিন” শব্দের ব্যবহার করেছেন কবিতায়। ডাক্তার তাকে ইনজেকশন দিয়েছিলেন যেন তিনি মারা যান; যন্ত্রণাহীন সহজ মৃত্যু। এরপর মদ খেয়ে জর্জ অন্নাদাল এর অন্য এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলেন। কী করতে চাইছিলেন তিনি? এবং রবিনসন—দারুণ রবিনসন!—ঠিক ওইখানে ছেড়ে দিচ্ছেন তোমাকে, হ্যাঁ, কী করতে চাইছিলেন? সনেটটি শোনো:
“তারা ডাকলো অন্নাদালে—আর আমি ছিলাম ওখানে
সাড়ম্বরে, ওই ডাকের উৎসে সারা দিয়ে, উপস্থিত হতে:
মিথ্যুক, চিকিৎসক, ভণ্ড, এবং বন্ধু,
লক্ষ্য করেছি তাকে: খুব একটা দূরে থেকে নয়
দু’একবার অন্যকোথাও-ও দেখেছি:
সারাতে পারিনা আমি, এমনই যন্ত্র এক—
তার ও সমাপ্তির মাঝে, যেন এক ধ্বংস,
রয়ে গেছে অন্নাদালে; আর আমি ছিলাম সেখানে।
“জানতাম সর্বনাশ হবে, কারণ তাকে আমি চিনি;
যদি পারো তো, একসাথে করো দু’জনকে,
আমার সবচেয়ে বাজে যা জানো স্মরণ করো।
এখন দ্যাখো, যেন আমিই তুমি, ওইখানে—
সামান্য, দুর্বল শরীর আমার। দেখতে পাও?
এইভাবে…শেষ করে দেবে না নিশ্চই? কিছুতেই না।”
এখন আসো আমার কবিতা জুডাস বিষয়ে, কে এই জুডাস, বলা যায়, সর্বস্ব হারানো এক বিশ্বাসঘাতক। এটা একটা—আর হ্যাঁ, আমি একে রবিনসনের অনুকরণ বলবো না, তবে যদি আমি রবিনসনের সনেট না পড়তাম তাহলে হয়তো এই কবিতাটা লিখতে চেষ্টা করতাম না।
সাক্ষাৎকারী : ফ্রস্ট পড়ে কী শিখেছেন আপনি?
জেমস রাইট : হুম, এ বিষয়ে প্রথমেই আমি তার এই মহাবিশ্ব নিয়ে গভীর, ভয়ানক আর ভীষণ করুণ এক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলবো, যা আমার কাছেও সত্য মনে হয়। জীবন অর্থহীন এ কথা কখনো বলিনি, বলেছি করুণ। অত্যন্ত মূল্যবান। ঈশ্বরকে, মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি এতো আনন্দিত যে কী করবো বুঝে উঠতে পারি না। কিন্তু এটা আবার নরকের মতো যন্ত্রণাও দেয়। এইটাই, কিন্তু আবার কৌশলগতভাবেও ফ্রস্টে কিছু আছে। বিশেষণ-কে কীভাবে উন্মোচিত করতে হয় তা ভালো জানেন। উদাহরণ হিসেবে তার “লজ্ড” কবিতাটির কথা বলা যায়। খুব ছোট্ট কবিতা। একটি ক্রিয়া-বিশেষণ আছে এতে— “প্রকৃতপক্ষে”—আর এই একটি ক্রিয়া-বিশেষণ-ই, আমার কাছে মনে হয়েছে, বন্দুকের গুলির মতো আঘাত করার সামর্থ্য রাখে।
সাক্ষাৎকারী : ফ্রস্ট—আমেরিকার এক বড়ো মাপের প্রকৃতির কবি। আপনি