‘সব কিছুই রাজনৈতিক।এমন কি একটি গোল্ডফিশের যৌনজীবন ও রাজনৈতিক।’
উপস্থিত পাঠকের প্রশ্নের উত্তরে যখন এইরকম একটা কথা ছুড়ে দেন, তখন তিনি আর শুধুমাত্র ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’র লেখক থাকেন না, তিনি তখনপুরো বিশ্বের কণ্ঠের রিপ্রেজেনটেটিভ হয়ে ওঠেন। ২০১৭সালের জুন মাসের ৬ তারিখ প্রকাশিত হয় ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ আর নিউইয়র্কের ব্রুকলিন একাডেমি অব মিউজিকের অপেরা হাউসের সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন ১৯জুন ২০১৭সালে। সেখানে ও ঘটেছে এক অনন্য ঘটনা, তিনি বলেছিলেন, ‘কী বলব, তারচেয়ে বরং আমার বই থেকেই পড়ে শোনাই’। তিনি যেন কিছুটা বিব্রত, অপ্রস্তুত ছিলেন।পুরো হল ভর্তি মানুষের হাতে তার লেখা বই ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’।
একটা উপন্যাসের আলোচনা যখন একজন ব্যক্তিতে বার বার আপতিতহয়, তখন বোঝা যায়, সেই ঔপন্যাসিকের ইমেজারি ভিউও লেখার তীব্রতা কতটা প্রবল!
১৯৯৭ সাল, নীলক্ষেতের রাস্তায় তীব্র উত্তাপ, আর আমার ভেতরে আরও উত্তাপ। কারণ বিশ্ব তোলপাড় করা উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মলথিংস’ প্রকাশিত হয়েছে। পুরো মাসের হাতখরচের তোয়াক্কা না করে কিনে নিলাম ‘দ্য গড অব স্মল থিংস, যখন আমার মনের মধ্যে তীব্রভাবে আসন গেড়ে আছেন ফিওদর দস্তয়ভস্কি, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, বোর্হেস, লিও তলস্তয়, আন্তন চেখভ, জ্যাক লন্ডন, আলব্যেয়ার কামু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমদ ছফা প্রমুখেরা। কিন্তু ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ পড়ার পর, একলাফে ভালোলাগার পারদ ওঠে গেল এবং তালিকায় যুক্ত হলো অরুন্ধতী রায়। সেটা যেমন তার উপন্যাসের ভাষিক রাজনীতির জন্য, তেমনি তার ব্যক্তিজীবনের নানা নিরন্তর সংগ্রামের জন্য।অরুন্ধতী রায় এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, তিনি আর ফিকশন লিখবেন না, তার যুক্তি ছিল এমন: তার যা বলার ছিল, তা তিনি ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন।দ্য গড অব স্মল থিংস প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ বছর কেটে যায়। তারপর প্রকাশিত হয় ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’।

দ্য গড অব স্মল থিংস বইটি ছিল একটি নিষিদ্ধ প্রেমের অনন্য মন্থন।গীতল নন্দন আর কাব্যময় ভাষায় একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডির পরিমিত প্রকাশ।অরুন্ধতী রায়ের উপন্যাসের ভাষার নির্মিতি চোখে পড়ার মতো, দৃষ্টি ধাঁধিয়ে দেয়ার মতো, যে চোখ থকে মনের গভীরে পড়ে সেই অনুরণন।দ্য গড অফ স্মল থিংস বইটি প্রকাশের পরবর্তী ২০ বছর অরুন্ধতী রায় যে নিভৃতে নীরবে কাটিয়েছিলেন, তা নয়। সেই সময়ে সাহিত্য ছেড়ে দেন এবং পক্ষান্তরে তিনি বেছে নেন ‘প্রতিবাদ রাজনীতি’। জড়িয়ে পড়েন ভারত সরকারের নিগ্রহনীতির বিরোধিতায়। যুক্ত হন মাওবাদীদের সঙ্গে। ভূমিহীন–দলিতদেরসঙ্গে।ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষেও কথা বলেছেন স্বদর্পে।অরুন্ধতী রায় ভারতের পরিবেশবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একদিকে সরকার, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তার সুবিধাভোগীদের রোষানলে পড়েন। ইরাক যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে মার্কিনসাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও তিনি হয়ে ওঠেন এক প্রধান সমালোচক। ইরাক যুদ্ধ শুরুর আগে নিউইয়র্কের কুপার ইউনিয়নে কয়েক হাজার লোকের সামনে ওই যুদ্ধের সাম্রাজ্যবাদী ও নয়াউপনিবেশবাদী চরিত্র তুলে ধরেন।
মূলত আলাদা করে অরুন্ধতী রায় সম্পর্কে বহু বহু আলোচনা চলে আসে কারণ তার ব্যক্তিজীবন এত বৈচিত্র্যপূর্ণ বলেই। একজন কথাসাহিত্যিক কীভাবে যেন রাজনৈতিক ভাষ্যকার হয়ে ওঠেন। তখন সমালোচনাও কম হয়নি।রাশান সাহিত্যের বড় বড় সাহিত্যিকেরা অ্যাকটিভিস্ট না হলেও মানুষের পাশে থাকার নিরন্তর সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন।সেই তুলনায় আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষের লড়াইয়ে একাত্ম হয়ে আবার লেখায়ও সারা পৃথিবীকে জানান দেওয়ার সংখ্যা নেই বললেই চলে। মহাশ্বেতা দেবী‘র পর অরুন্ধতী রায়–ই সবচেয়ে ভাস্বর, বলা চলে সর্বাধিক আলোচিত। অন্যভাবে বললে সারাবিশ্বেই আলোচিত।
দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’র পাঠ শেষ। আলাপচারিতা চলছে এবং প্রশ্নোত্তর। ‘সাহিত্যিক যখন রাজনীতিক হয়ে ওঠেন, তা কি সাহিত্যের জন্য অশনিসংকেত নয়?’ এমন প্রশ্নে তিনি রেগে যাননি, তিনি বলেন, ‘লেখক যদি তাঁর সমাজ নিয়ে