কবি মাসুদ খান বাংলা কবিতার একটি স্বতন্ত্রস্বর। বাংলা কবিতার নানামুখী প্রবণতার মধ্যে তাঁর গতিপথ ভিন্ন বলয়ে স্বকীয় ভঙ্গীতে রচনা করেন প্রাজ্ঞতার সাথে। আভিধানিক শব্দের চরিত্র হনন করে শব্দের নবনির্মাণ করেন অপ্রচল অনুষঙ্গে। তিনি বাংলা কবিতায় যে মাত্রায় শাসন-সংহতির সমন্বয়ে বিদ্যমান সময়ের অসংগতি, রাজনৈতিক হতাশা ও জীবনবোধের টানাপোড়নের অনিবার্য পরিণতিতে বিদ্রুপ আর কষাঘাতের ভাষায় শাণিত হয়ে ওঠেন তা তাঁর অনন্য অভিযাত্রায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। মিথের সাথে ইতিহাসের সমন্বয় এবং উপমা ও চিত্রকল্পের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি পলিমাটির শাঁসের ভেতর থেকে প্রজন্মের ইতিহাস রচনার শস্যদানা সঞ্চয় করেন। তাই তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে নৈঃশব্দের প্রগাঢ়তায় বিমূঢ় প্রেক্ষাপটে তুমুল উচ্চনিনাদ।
কবি মাসুদ খানের কাব্যচিন্তা, দর্শন, ইতিহাসচেতনা ও অচলায়তনের বিপরীতে সঞ্চারিত দ্যুতির গতিময়তা নির্ণয়ের লক্ষ্যে অনেকদিন ধরে নানামুখী বিচার বিশ্লেষণ, আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। কবির সৃষ্টিশীলতার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রচুর বিশ্লেষণমূলক লেখালেখি হয়েছে ও হচ্ছে । আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, কবির সাহিত্যকর্ম নিয়ে নানামুখী গবেষণা অব্যাহত থাকবে। মন-মানচিত্র’র পক্ষ থেকে কবির সাথে আলোচনা হয়েছে এবং তিনি সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। সেজন্য আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কবির সামগ্রিক সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কাজ করছেন তাদের সাথে যোগাযোগ করে তাঁদের লেখা পুনর্মুদ্রণের অনুমোদন পেয়ে এই বিশেষ আয়োজনটি করতে সক্ষম হয়েছি। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণমূলক মূল্যায়নগুলো একত্রে গ্রথিত করে পাঠকের সামনে তুলে ধরা যাতে কবির কাব্য অন্বেষার সাথে পরিচিত হতে পারে। এ ব্যাপারে কবি চঞ্চল আশরাফ, বিশিষ্ট সাহিত্য বিশ্লেষক মোহাম্মদ নূরুল হক, সাহিত্য সমালোচক ও প্রাবন্ধিক মামুন রশীদ, কবি ও প্রাবন্ধিক আলমগীর নিষাদ এবং লেখক ও প্রাবন্ধিক কুদরত-ই-হুদা সাগ্রহে সাড়া দিয়েছেন। আমি তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
পাঁচটি মূল্যবান আলোচনার সাথে কবির একগুচ্ছ কবিতা ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও সংযুক্ত করা হলো।
মাসুদ খানের সাম্প্রতিক কিছু কবিতা
আন্তর্জাগতিক
ভিন গ্যালাক্সির মেয়ে তুমি, ভিন্ন গ্রহের মেয়ে
তোমায় আমি ফুটিয়ে তুলি ইচ্ছাশক্তি দিয়ে।
দেখতে কেমন, ভাষা কী তার, কেমন অবয়ব—
জড়বুদ্ধি জাহিল আমি, জানি না ওসব।
তার মন তৈরি রূপ তৈরি কেমন উপাদানে
কল্পভীরু এই কবি আর কীই-বা তার জানে!
জানি না তার অনুভূতি, আবেগ, স্বভাবগতি
স্রেফ অনুমানেই ফুটিয়ে তুলি, এমন প্রাণবতী!
ছায়াপথ ছাড়িয়ে, দূরের ওই সুরগঙ্গা, তারও ওইপারে, বহির্গোলকে,
শঙ্কু-আকৃতির এক মিটিমিটি আলো-জ্বলা ঘরে ব’সে
ভিন্ন ভুবনের মেয়ে তুমি
নির্নিমেষ চেয়ে আছ হে আমারই জানালার দিকে।
হৃদয়ের নেশা, এক আন্তর্জাগতিক নেশা…
একদিন ঘনিয়ে আসব ঠিকই দুইজনে, পরস্পরে।
তোমার আমার ঘনীভূত অভিকর্ষ দিয়ে
আস্তে-আস্তে বাঁকিয়ে ফেলব দেশকাল
দূর দুই জগতের মাঝখানে যে ব্যাকুল মহাশূন্য,
বেঁকে যাবে তা টানটান অশ্বক্ষুরাকার চুম্বকের মতো।
আলোকবর্ষের ওই মহাদূর দূরত্বই হয়ে যাবে
তুড়ি-মেরে-উড়িয়ে-দেওয়া ঘণ্টা কয়েকের পথ।
আর আমি ঠিকই সাঁতরে পাড়ি দেবো ওইটুকু মহাকাশ।
জ্যামিতির ছুড়ে-দেওয়া এক জেদি অথচ লাজুক স্পর্শকের মতো
তোমাকেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাব আমি
পৃথিবী নামের গ্রহ থেকে ছোটা হেমন্তদিনের হাওয়া।
তৃষ্ণা
তেতে-ওঠা বালুর ওপর দিয়ে হাহাকার করে ধেয়ে আসে
এক মরুসরীসৃপ, মুসাফিরের দিকে।
‘বিষ ঢালব না, ছিঁড়ে খাব না মাংস, শুধু একটু গলা ভেজাব রক্তরসে,
এমন ছাতিফাটা কহর তৃষ্ণায় প্রাণ যায়-যায়, এটুকু রহম করো হে বেদুইন’
ব’লে সেই গনগনে সরীসৃপ ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বিদ্যুৎ গতিতে,
গোড়ালি কামড়ে ধরে রক্ত শুষে ভিজিয়ে নেয় জিহ্বা ও গলা,
তারপর নিমেষে উধাও, এক ক্ষমাহীন বিষুবীয় ক্রুদ্ধ মরীচিকার ভেতর।
দীক্ষা
পথ চলতে আলো লাগে। আমি অন্ধ, আমার লাগে না কিছু।
আমি বাঁশপাতার লণ্ঠন হালকা দোলাতে দোলাতে চলে যাব চীনে, জেনমঠে
কিংবা চীন-চীনান্ত পেরিয়ে আরো দূরের ভূগোলে।
ফুলে-ফুলে উথলে-ওঠা স্নিগ্ধ চেরিগাছের তলায় বসে মৌমাছির গুঞ্জন শুনব
নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো, দেশনার ফাঁকে ফাঁকে।
মন পড়ে রইবে দূরদেশে। সাধুর বেতের বাড়ি পড়বে পিঠে,
দাগ ফুটবে সোনালু ফুলের মঞ্জরীর মতো শুদ্ধ সালংকার…
দীক্ষা নেব বটে মিতকথনের, কিন্তু
দিনে-দিনে হয়ে উঠব অমিতকথক,
নিরক্ষর হবার সাধনা করতে গিয়ে আমি হয়ে উঠব অক্ষরবহুল
এই হাসাহাসিভরা ভুঁড়িটি ভাসিয়ে গল্প বলে যাব
কখনো প্রেমের ফের কখনো ভাবের…
অথবা ধ্যানের, কিংবা নিবিড়-নিশীথে-ফোটা সুগভীরগন্ধা কোনো কামিনীফুলের।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরবে মঠের মেঘলা আঙিনায়
ওদিকে অদূরে লালে-লাল-হয়ে-থাকা মাঠে পুড়তে থাকবে ঝাঁজালো মরিচ
সেই তথ্য এসে লাগবে ত্বকে ও ঝিল্লিতে।
আমি সেই মরিচ-পোড়ার গল্প বলব যখন–
ঝাঁজের ঝাপটায় উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গিয়ে যুদ্ধে যাবে সবে, এমনকি বৃদ্ধরাও।
যখন প্রেমের গল্প– কমলায় রং ধরতে শুরু করবে সোনাঝরা নরম আলোয়।
আবার যখন গাইব সে-গন্ধকাহিনি, সেই ভেজা-ভেজা রাতজাগা কামিনীফুলের–
ঘ্রাণের উষ্ণতা লেগে গলতে থাকবে মধুফল দেহের ভেতর।
ব্লিজার্ড
আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে ফিরে
সমগ্র নীলিমা তছনছ করে দিয়ে
কোটি-কোটি দুষ্ট দাপুটে শিশু খেলছে হুলুস্থুল বালিশ ছোড়ার খেলা।
অজস্র কার্পাস ঝরছে
লক্ষকোটি বালিশফাটানো তোলপাড়-করা অফুরন্ত তুলা।
যেন তুলারাশির জবুথবু জাতক হয়ে পড়ে আছে ধীরা ধরিত্রী, বিব্রত বেসামাল।
সাথে উল্টাপাল্টা ঝাড়ি একটানা বেপরোয়া বাবুরাম পাগলা পবনের।
আবার কোত্থেকে এক নির্দন্ত পাগলিনীর আকাশ-চিরে-ফেলা ওলটপালট অট্টহাসি
মুহুর্মুহু অট্টালিকায় প্রতিহত হয়ে ছুটছে দিশাহারা দিগবিদিক
ঘরবাড়ি মিনার-ময়দান বাহন-বিপণী আড়ত-ইমারত গাছপালা বন বন্দর বিমান
সবকিছুর ওপর এলোপাথাড়ি থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে বের করে আনছে
তুলকালাম গোপন তথ্য, তুলাজটিল শীৎকার।
তুমি, তোমার সরাইখানা এবং হারানো মানুষ
একটি দিকের দুয়ার থাকুক খোলা
যেইদিক থেকে হারানো মানুষ আসে।
রান্নাবাড়ার ঘ্রাণ পেয়ে পথভোলা
থামুক তোমার সরাইখানার পাশে।
আজও দেশে দেশে কত লোক অভিমানে
ঘর ছেড়ে একা কোথায় যে চলে যায়!
কী যাতনা বিষে…, কিংবা কীসের টানে
লোকগুলি আহা ঘরছুট হয়ে যায়!
এ-মধুদিবসে আকাশে বাতাসে জাগে
ঘর ছাড়বার একটানা প্ররোচনা।
হারিয়ে পড়তে নদী মাঠ বায়ু ডাকে
ঘরে ঘরে তাই গোপন উন্মাদনা।
জগতের যত সংসারছাড়া লোক
ঘুরে ফিরে শেষে সরাইখানায় স্থিত।
এ-স্নেহবর্ষে তুমি কি চাও যে, হোক
ঘরছাড়া ফের ঘরেই প্রতিষ্ঠিত?
হারানো মানুষ সেই কত কাল ধ’রে
স্বজনের ভয়ে দেশ থেকে দেশে ঘোরে।
স্বজনেরা তবু নানান বাহানা ক’রে
বৃথাই খুঁজছে কালে ও কালান্তরে!
স্বজন যখন খোঁজে উত্তরাপথে
হারানো তখন দাক্ষিণাত্যে যায়।
স্বজন যখন নিরাশাদ্বীপের পথে
হারানো খুঁজছে নতুন এক অধ্যায়।
স্বপ্নভূভাগ
এবার বলো হে ফিরতিপথের নাবিক,
ওহে মাথা-মুড়িয়ে-ফেলা ভিনদেশি কাপ্তান,
সেই দ্বীপের খবর বলো
যেইখানে মানিপ্ল্যান্ট ও সোলার প্ল্যান্টের পাতারা
একযোগে চিয়ার্স-ধ্বনি তুলে পাল্লা দিয়ে
পান করে রোদের শ্যাম্পেন।
কোন প্রজন্মের উদ্দেশে তাদের সেই স্বতঃস্বাস্থ্যপান?
সেই দ্বীপদেশের কথা বলো যেখানে নারীরা
সামান্য একটি কাঠের কুটিরে
ফুটিয়ে তোলে অন্তত বাষট্টি রকমের বাৎসল্য ও প্রীতি।
প্রীতিপরবশ সেই কুটিরের কথা বলো, সেই
একটানা মমতালোকের কথা বলে যাও হে কাপ্তান
যে-দেশে নিশুতি রাতে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা
পথ চলে শিস দিয়ে, তুড়ি বাজাতে বাজাতে।
আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে
তালে-তালে পাল্টা তুড়ি বাজিয়ে সাড়া দেয়
নবীন উলটকমলের চটপটে পাতা ও পল্লব।
এবং হঠাৎই, টাশ-টাশ করে কথা বলে ওঠে
তরুণী বনবিড়ালিনীর সদ্য-বোল-ফোটা কনিষ্ঠা মেয়েটি।
তাক লাগিয়ে দেয় দ্বীপদেশের অরণ্য অধ্যায়ে।
নাবিক, অবাক সেই ভূভাগের কথা বলো
যেখানকার মাটি উষ্ণ, অপত্যবৎসল,
যেখানে মানুষ সোজা মাটিতে শুয়ে প’ড়ে
শুষে নেয় অষ্টাঙ্গে ভূতাপশক্তি সঞ্জীবন…
দেহ ও মাটিতে যোগাযোগ হয় একদম সরাসরি,
সোজা ও সহজ।
আমরাও তো চলেছি উজানে।
চলছি তো চলছিই অনিঃশেষ
উত্তর পেরিয়ে আরো দূর উত্তরোত্তর অঞ্চলে…
উগ্র লোনা বাতাসের সোহাগে, লেহনে
বিকল হয়েছে আমাদের সেক্সট্যান্ট
মর্চে ধরেছে কম্পাসে, দুরবিনে।
চলেছি তবুও।
বহু প্রত্যাশার, বহু সাধ-সাধ্য-সাধনার যোগ্য
স্বপ্নভূভাগ কি এরকমই দূর ও দুর্গম, যোগাযোগাযোগ্য?
অলুক, অনশ্বর
তোমরা কারা? কতদূর থেকে এলে?
মনোহরপুর? মধুপ্রস্থ? লীলাস্থলী? অবাকনগর?
কোন যুগেরই-বা তোমরা?
উপলীয়? তাম্র? প্রত্ন? নাকি নুহের আমল?
যে যেখান থেকে যে-যুগ থেকেই আসো-না-কেন
একই জাহাজের যাত্রী আমরা এ অকূল মহাকাশে।
সহযাত্রী, এবং সমবয়সী।
তোমাদের বয়স প্রায় চৌদ্দ শ কোটি বছর, আমাদেরও তা-ই।
যে-যে কণিকায় গড়া দেহ তোমাদের, আমাদেরও তা-ই–
অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু?
বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি
অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান—
অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান।
জরা ব্যাধি মন্বন্তর মহামারী অনাহার অত্যাচার গুম খুন দুর্বিপাক দুর্ঘটনা
কোনো কিছুতেই হবে না কিছুই, ধস নেই, মৃত্যু নেই,
ক্ষয়ে যাওয়া ঝরে যাওয়া নেই
শুধু বয়ে চলা আছে, রূপ থেকে রূপান্তরে,
রূপক থেকে ক্রমশ রূপকথায়…
জলে স্থলে মহাশূন্যে অগ্নিকুণ্ডে…কোত্থাও মরণ নাই তোর কোনোকালে…
সাড়ে চার শ কোটি বছরের পুরনো এক সজল সবুজ
কমলা আকারের মহাকাশযানে চড়ে
চলেছি সবাই এক অনন্ত সফরে।
প্রলাপবচন
নদ এসে উপগত হবে ফের নদীর ওপর
দুই পারে জমে উঠবে কপট কাদার ঘুটঘুটে কেলেংকারি
মাঝখানে চোরাঘূর্ণি চোরাস্রোত
এলোমেলো এলোমেলো বাউরি ভাবনা এসে
পাক খেয়ে ঢুকে পড়বে বৃষ থেকে মিথুনের অধিক্ষেত্রে।
মাকাল ফলের মৃদু মনস্তাপ
করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ
কোকিলস্য প্রবঞ্চনা, কাকের বাসায় উপঢৌকন
ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা-ভেজা সুর
হুদহুদ পাখির অস্থিরতা, অসমাপিকার লঘু তঞ্চকতা
একরোখা অশ্বের অস্মিতা, উগ্রবসনা আগুনের চঞ্চল রসনা…
আলগোছে সবকিছু পাশ কেটে গিয়ে
ওইদিকে বর থাকবে কনের বশে
খলনায়কের দাঁতের নিচে পড়বে কট্টরপন্থী কাঁকর
চার্জ করা হবে পশ্চিমের ব্লাস্ট ফার্নেসে
আর ঝাপটা এসে লাগবে পূর্বেরটা থেকে
খামাখা দিওয়ানা হবে রঙিলা বিড়ালিনী
ঘনঘন গণ-হাইপ উঠবে মামুলি ঘটনা ঘিরে এমনি-এমনি
হিস্টিরিয়ায় কাঁপতে থাকবে দেশকাল
সাত সাধু এক হবে, এক শয়তান সাত
দোষযুক্ত আলু নামবে হিমাগারের শ্রোণিচক্র থেকে…
এবং হয়তো আমি একদিন ঠিকই
পড়ো-পড়ো ঘরকে যোগাতে পারব
গাঁট-অলা তিন-বাঁকা শালকাঠের সমর্থন
নিশ্চিহ্নকে দেখাতে পারব কিছু লুপ্তপ্রায় চিহ্নের ইশারা
বিশেষকে কোনো ভ্রান্তিকর নির্বিশেষের আভাস
বেদিশাকে দিশার বিভ্রম…
আর দুম করে লিখে ফেলব এমন এক কবিতা একদিন,
যা পড়ে ভৌতিক সুর তুলবে একসঙ্গে সাধু ও শয়তান
সাপ-আর-অভিশাপে-গড়া মতানৈক্যে-ভরা গামারিকাঠের গিটারে
আর ‘চলে আয়’ বলে স্বয়ং ঈশ্বর টুইট পাঠাবেন দিব্য টুইটারে।
মাসুদ খান
কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। বর্তমানে কানাডায় বসবাস।
প্রকাশিত বই:
পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩, পুনঃপ্রকাশ ২০১৯)
নদীকূলে করি বাস (২০০১)
সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)
আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১)
এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪)
দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)
প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬)
প্রসন্ন দ্বীপদেশ (২০১৮)
গদ্যগুচ্ছ (২০১৮)
শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৮)
পাখপাখালির গান পাগলাঝোরার তান (২০১৯)
ঊর্মিকুমার ঘাটে (২০২০)
বিভিন্ন আলোচক, বিশ্লেষক ও গবেষকের আলোচিত কিছু লেখা মন-মানচিত্রের পাঠকদের জন্য এখানে দেয়া হলো। আশা করি, নিম্নোক্ত লেখাগুলো কবি সম্পর্কে পাঠককে পরিষ্কার ধারণা দিতে সক্ষম হবে।
চঞ্চল আশরাফ

অর্থান্তরের ‘হাওয়া’
কবি মাত্রই তার জন্মার্জিত নশ্বরতার বিপরীতে দাঁড়াতে চান, তাঁকে চ্যালেঞ্জও করেন। এটা করতে গিয়ে প্রচলিত যে জীবন, তার ধারণাকেও তিনি উপেক্ষা করেন, আক্রমণ করতেও কুণ্ঠিত হন না। ফলে প্রচলিত জীবনের যা-কিছু, বোধ, শব্দ, তার অর্থ, রুচি, অভিব্যক্তি সবই তিনি ডিঙিয়ে যেতে চান। এই চাওয়া, তার সাধনাই কবির নিজস্ব পৃথিবী নির্মাণের অপরিহার্য শর্ত।
মাসুদ খানও যে সেই শর্তের অনুগামী, তা বারবার প্রমাণিত। তাঁর কোনো কোনো কবিতা এই মন্তব্যের উজ্জ্বল বাহক হয়ে আছে। তারই একটি হলো ‘হাওয়া’—নদীকূলে করি বাস কাব্যগ্রন্থের কবিতা এটি। কবিতাটি শুরু হয়েছে এই লাইন দিয়ে : সারাদিন বিভিন্ন রকম হাওয়া বয়। হাওয়া!—এই উচ্চারণেই আভিধানিক অর্থজগৎ থেকে ‘হাওয়া’র মুক্তি ঘটে। এই মুক্তিতেই কবির উদ্যম নিঃশেষিত হলে চলে না। শব্দটির সঙ্গে এমন এক জগৎকে জড়িয়ে নিতে হয়, সেখানে যেন সেটি উল্লেখমাত্র হারিয়ে না যায়। ফলে কবির কাজ হয়ে দাঁড়ায় শব্দটির অর্থের পর অর্থ সৃষ্টি করা। এই অর্থান্তরের মেলায় গড়ে ওঠে অন্যতর জগৎ। ও তার সৌন্দর্য। হাওয়া শব্দটির অর্থের পর অর্থ সৃষ্টি করেছেন মাসুদ খান, তাতে গড়ে উঠেছে অন্যতর জগৎ। ‘অনেক দূরের দেহে, দূর মেরুরেখায় শোষিত হয়ে হয়ে/ আজ পুনর্মুক্ত হচ্ছে এখানে, এখন/ এই মধ্যপ্রকাশ অঞ্চলে।’ হাওয়ার একটা অঞ্চলে পুনর্মুক্ত হওয়ার চিন্তা মামুলি বা সাধারণ কিছু নয়, হাওয়ার যে অর্থ প্রচলিত, তাতে এই ভাবনা সঙ্গত নয়। কিন্তু এটা তো অর্থান্তরের উপক্রমণিকা, কেননা ‘গোলকের ওই পার থেকে’ হাওয়া এসে ‘প্রতিটি বিভাগ আর দিবস-রাত্রির দেহে দেহে / স্থির হয়ে আছে।’ এখানে অর্থান্তরের পূর্ণতা ঘটল।
হাওয়ার ‘স্থির হয়ে’ থাকার পর, কেবল নতুন অর্থ সৃষ্টিতেই সন্তুষ্ট নন কবি। তিনি শব্দটি পরের স্তবকে উচ্চারণ করেন না—সে-জায়গায় দু’টি বিশেষণসমেত ব্যবহার করেন বিকল্প শব্দ—‘একদিন সম্ভবত অস্থির অচেনা এক বায়ুপ্রবাহের/ মধ্যেই মুদ্রিত হয়ে রবো’। এখানে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে সংশয়বাচক ‘সম্ভবত’ দিয়ে আর ‘হাওয়া’ হয়ে উঠল বায়ুপ্রবাহ, তাতে ‘মুদ্রিত’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ভবিষ্যৎবাচক ‘রবো’ ক্রিয়াপদটি আমাদের দূর-পূর্বসূরিদের ব্যবহার-করা; কিন্তু মাসুদ খানের এই কবিতায় বেশ মানিয়ে গেছে। শেষ অনুচ্ছেদের শেষাংশটুকু এই:
রকমারি রৌদ্র আর মরুবালুকার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া গৌণ সংবাদের মতো
বায়ু বয়ে যায়।
মৃদু-মৃদু, গম্ভীর, বিশিষ্ট ভাবমূর্তি সহকারে।
উল্লেখ বাহুল্য নয়, পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে ‘বায়ুপ্রবাহের/ মধ্যেই মুদ্রিত’ হয়ে থাকবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পর যখন কবি উচ্চারণ করেন : ‘তার বেশ আগে/ আমাদের অসম্পূর্ণ রেখে,/ আমাদেরকে অশেষ করে দিয়ে বায়ু বয়ে যায়’—তখন কালের প্রচলিত ধারণাটির নস্যাৎ হয়ে যায়। অভিধানের অর্থ থেকে শব্দকে মুক্ত করার পর তা উচ্চারণের জন্য এমন এক ভাষাপৃথিবী গড়ে তুলতে হয় কবিকে, যা প্রচলিত ভাবনা, তার প্রক্রিয়া আর উপাদানের সমস্ত ইউনিটকে আমূল বদলে দেয়। এখানেও ঘটেছে তা-ই। কিন্তু মাসুদ খান এক্ষেত্রে সম্ভবত এক ধরনের রফা করেছেন। তিনি যখন উচ্চারণ করেন—‘আমাদের অসম্পূর্ণ রেখে’ তখন এটা মনে হতে পারে মানুষের জীবনের অসম্পূর্ণতা সম্পর্কিত ধারণাটিকে মান্য করছেন। এই কথাটির দরকার আছে। কেননা, এতে কবির ভাষাপৃথিবীর সঙ্গে প্রচলিত ভাষাকাঠামোর ঘটকালির কাজটুকু হয়ে যায়। এটুকু না হলে, কবিতা প্রলাপে পরিণত হয়। এবং যখন বলা হচ্ছে ‘নদীকূলে বংশপরম্পরাক্রমে, আমার পুত্রের, তার পুত্রের, এবং দৌহিত্রের/ বহু চুল এলোমেলো করে দিয়ে’ ‘বায়ু বয়ে যায়’—আমরা বায়ুর পরিচিত অর্থের জগতে প্রবেশ করি। সেই জায়গা থেকে কবি আবার শেষে পাঠকের পরিচিত পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসার মুখে ফেলে দেন ‘বিশিষ্ট, গম্ভীর, ভাবমূর্তি সহকারে’ বায়ুর বয়ে যাওয়ার কথা বলে। ব্যক্তিত্ব আরোপের মধ্য দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত অর্থান্তরের খেলায় পাঠকের স্নায়ুকে সক্রিয় রাখতে চান। মাসুদ খানের এই অর্থান্তর-খেলার প্রতিপক্ষ প্রচলিত পৃথিবী, তার অনুষঙ্গে প্রচলিত, বিবর্ণ আর একঘেয়ে অর্থরাশি।
মাসুদ খানের কবিতাঃ আবেগে ও প্রজ্ঞায়
