You are currently viewing সৌমেন দেবনাথ  || শেষের কবিতার শেষ পৃষ্ঠা

সৌমেন দেবনাথ || শেষের কবিতার শেষ পৃষ্ঠা

সৌমেন দেবনাথ || শেষের কবিতার শেষ পৃষ্ঠা

 

শ্বেতার বসন-ভূষণ, গমন, চঞ্চল-চলন, নড়ন, নূপুর-নিক্বণ, অলংকার-শিঞ্জণ, হাস্য-ভাষ্য বা অঙ্গ প্রতঙ্গের নানান ভঙ্গিমাতে কে উৎক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত প্রক্ষিপ্ত হবে না! এত বিকশিত সৌন্দর্য চোখ যুগলকে ধাঁধিয়ে দেয়, তাঁতিয়ে দেয়। তার সদা লাবণ্যোচ্ছ্বাসে প্রফুল্ল হৃদয় অত্যাশ্চর্যে নৃত্য করে। বিস্ময় অপেক্ষা স্বতন্ত্র সৌন্দর্যে উত্তাল হৃদয় সাগর৷ মনোভাবকে প্রচ্ছন্ন না রাখতে পেরে নির্মল বললো, আপনার সৌন্দর্য নয়না-নন্দনা নায়িকা অপেক্ষা ন্যূন নয়।

শ্বেতার স্বভাব সুলভ হাসি। নির্মলের মুগ্ধ দৃষ্টি দ্বারা শ্বেতা আক্রান্ত হয়। শ্বেতার চক্ষু দুটো যে কারোর শরীর মনে ভালো লাগার আবেশ প্রবাহ কেন্দ্র। নির্মল নির্লজ্জের মতো আবার উচ্চারণ করলো, আপনার সৌন্দর্য সৌন্দর্যের সংজ্ঞা অপেক্ষা সুন্দরতর।
শ্বেতা নিজ কর্মে মনোনিবেশ করতে করতে বললো, যার হৃদয় যত সুন্দর তার দর্শনে তত সৌন্দর্য ধরা দেয়।

বলেই শ্বেতা একটা হাসি দিলো। মুক্তো হয়ে ঝরলো সে হাসি। লাবণ্যমাখা মুখটিতে হাসি জাগলেই বিভা ছড়িয়ে পড়ে চৌদিকে। না দেখার ভান করে দেখে নিয়ে নিজেকে লুকাতে গিয়ে শ্বেতার চোখে ধরা পড়লো নির্মল। শ্বেতা বললো, সুন্দরী হলে নানা সমস্যা, মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে।
নির্মল হেম-অগ্নির মতো পবিত্র আর কাশফুলের মতো শুভ্র শ্বেতার দিকে চেয়ে বললো, সুন্দরের প্রতি মানুষ চিরকাল দুর্বল। সুন্দর আর সৌন্দর্য দেখারই। পুরুষ দেখবে, পুড়বে, জ্বলবে, ভাববে, ভাবে পড়বে, হিংসা করবে, প্রশংসাও করবে। অন্তত দেখতে মানা করবেন না।

শ্বেতা শুনে আবারও হাসি দেয়। তা দেখে নির্মলের রেঙে উঠে হৃদয়। শরীর মনে বয়ে যায় অন্য এক আবেশ। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থেকে মনে মনে ভাবে, তোমায় দেখে আমার জীবনে সুখ ফলছে জামের মতো থোকায় থোকায়।
নির্মল কাজে উদাসীন হয়ে পড়ে। বারবার নজর ঐ নজরনন্দন নারীটির দিকে চলে যায়। নির্মল হেসে বললো, আপনার অমিয় বাক্য আর বাক্য উচ্চারণ ভঙ্গিমা শিহরণ দেয় মানসপটে।
শ্বেতা বললো, নির্মল বাবু, বড়ো নির্মল মনের আপনি। নির্মল আকাশের মতো চোখে সব স্বচ্ছ লাগে।
নির্মল অবাকদৃষ্টে চেয়ে বললো, আপনার রূপের আগুনে না জানি কতো প্রাণ জ্বলে মরেছে!
শ্বেতা বললো, অন্তত আপনি যেন অগ্নি অভিমুখে পতঙ্গ হয়ে না ছোটেন, তবেই রক্ষা। শোনেন, চটকে চোখ জুড়ালে ঠকতে হয়। আমি যদি আপনার সামনের ডেস্কে না বসতাম, আপনি আপন মনে কাজ করতে পারতেন। এখন তো আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। চকচকেতে আর ঝকঝকেতে ডুবে অনেক বীর পর্যন্ত ডুবেছে। মনকে প্রশ্রয় দেবেন না, মনকে কাজে লাগান।

উৎফুল্ল হয়ে উঠে নির্মল। এত কাছে শ্বেতা থাকে বলেই মনে তার এত পিয়াস। মনের মধ্যের আনন্দের স্রোত দুঃখ-কষ্ট-হতাশার তৃণগুলোকে ভাসিয়ে দিলো।
দুইজনেই কাজে মন দিলো। কিন্তু নির্মলের অস্থির মন বারবার শ্বেতার জন্য ব্যাকুল হয়। মায়াভরা মুখখানা চিত্রপটে সদা জেগে উঠে। ওষ্ঠপ্রান্তের মায়াবী হাসি অবাক বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তার সৌন্দর্যের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হতে থাকে ও। তার রূপের চুম্বকীয় আর আকর্ষণীয় শক্তি সাংঘাতিক আঘাত করে নৈমিত্তিক কাজের মাঝে। মন আকাশের আঙিনায় পূর্ণ চাঁদ থাকলে কখনো কি কাজে মন বসে! সাজানো-গোছানো চুলগুলো বাতাসে উড়ে উড়ে তাকে বিরক্ত করছে। চুলে অবারিত আনন্দের ঢেউ। এমন মায়াবী চেহারার নারীকে দেখলে কেন মায়া বাড়বে না! শ্বেতা কাজ থেকে চোখ তুলতেই দেখলো নির্মল ওর দিকে চেয়ে আছে। শ্বেতা বললো, কাজে এত অমনোযোগী কেন? স্যার বকলে আমার কোনো দায় থাকবে না! কখনো বলিনি কাজে ফাঁকি দিয়ে আমাকে দেখেন!
নির্মল নির্লজ্জের মতো বললো, আপনার চোখে মাত্রাতিরিক্ত মায়া। কেবলি দাহ্য হই। আপনার রূপ-মাধুর্য অনন্য অপূর্ব। যত দেখি, তত ভাবী, তত ভালো লাগে!
শ্বেতা একটু বিরক্তির স্বরে বললো, পুরুষ হয়ে উঠেন। এত ছেলেমি কথা ভালো না।
শ্বেতা লাজুক হেসে মুখ নামিয়ে নিলো। নিতান্ত অকারণেই তার মুখাবয়বে ক্ষীণ আরক্ত লজ্জাভা দেখা গেলো।

অফিসের অন্যান্য কলিগরাও শ্বেতার দিকে বিশেষ নজরে তাকায়। সূর্যের সামনে চন্দ্র যেমন অর্থহীন, চন্দ্রের সামনে তেমনি ওরা অস্তিত্বহীন। শ্বেতা বিশেষ আনন্দ অনুভব করে। লেখাপড়াকালীনও কত বড়ো ভাই, বন্ধু এমনটা করতো। আলোচনার কেন্দ্রে থাকতো সে, তুলনাতেও অতুলনীয়ার স্থান পেত সে। পুরুষ সমাজকে মনোরঞ্জণে যেমন সে পারদর্শী আবার পুরুষ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতেও সে পাকা-পক্ব-দূরদর্শী। সুন্দরীদের মস্তিষ্ক অনুর্বর হলেও একেবারে ঊষর নয়। সুন্দরীরা জীবনে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, মুহূর্মুহূ বিপদেও পড়ে। যদিও সবার সহযোগিতা সে আবার আগেই পায়। শ্বেতা একটি কাজ বুঝতে না পারায় নির্মলের সাহায্যপ্রার্থী হলো, নির্মল সাহায্য করার জন্য উদগ্রীব। প্রত্যাশিত মানুষ কারণে-অকারণে সান্নিধ্যে এলে ভালো লাগা বেড়ে যায়। শ্বেতা বললো, জবটা পেয়েছি রূপের জন্য, গুণের বালাই নেই আমার মাঝে। কেন যে মানুষ রূপবিচারী? আগে গুণবিচারী পরে দর্শনধারী এ বাক্যে যারা বিশ্বাসী আমি তাঁদের শ্রদ্ধা করি।
নির্মল বললো, সবার দর্শন সমান নয়। কেউ তো সকল গুণে গুণান্বিত নয়। সব বিষয়ে পণ্ডিত এমন পণ্ডিত বিশ্বে আছে বলে আমি মনে করি না। দেখতে দেখতে, বুঝতে বুঝতে, শুনতে শুনতে, ঠেকতে ঠেকতে মানুষ অভিজ্ঞ হয়ে উঠে।
শ্বেতা বললো, ও আচ্ছা, আপনিও তবে দর্শনধারীতে বিশ্বাসী?
নির্মল বললো, আমি না, পৃথিবীর সবাই রূপবিচারী। রূপ দেখলে মানুষ গুণের কথা তেমন বিবেচনা করে না। রূপৈশ্বর্যের বন্যায় ভাসছে পৃথিবী। রূপসী বৌয়ের কাঁচা রান্নাও ততোধিক স্বাদের হয়। রূপসীদের ভুল কেউ ধরেও দেখে না। রূপসীদের কাঁচা কথাও যেন অমিয় বাক্য হয়ে ধরা দেয়।
শ্বেতা বললো, এক সময় রূপের প্রতি অভক্তি জন্মে যায়। রূপ দিয়ে মানুষের মন জয় করে রাখা যায় না দীর্ঘদিন। গুণের কদর আজীবন থাকে। রূপ বিপর্যয়ও আনতে জানে, গুণ কখনো ঠকাবে না। রূপ দেয় মোহ, গুণ দেয় সাফল্য।
নির্মল দ্বিমত পোষণ করে বললো, চাঁদ দেখে কেউ কখনো বিমুখ হয়েছে বলতে পারবেন? পাহাড় দেখে কেউ কখনো মন্দ বলেছে? কল্লোলিত স্রোতস্বিনীর বয়ে চলা দেখে কেউ কি ক্ষুব্ধ হয়েছে?
শ্বেতা বললো, রূপ মরীচিকা। রূপে ডুবে অনুতপ্ত হয়নি এমন যুবক নেই। রূপ একটা মায়া, আলেয়ার আলো। রূপের পিছে দৌড়ানো আর পঙ্কিলে ডোবা একই কথা। গুণীরা রূপ বিচার করে না, মূর্খরা রূপ বিশ্লেষণে সময় নষ্ট করে, রূপ ব্যবসায়ের জন্য, বিজ্ঞাপনের জন্য, সংসারে অশান্তি সৃষ্টির জন্য; গুণ পৃথিবীর রক্ষার ও সৌন্দর্যের জন্য।
নির্মল হেসে বললো, রূপবতীরা গুণবতী হয় না?
শ্বেতা বললো, রূপ আর গুণ কখনো একসাথে পাওয়া যায় না। রূপবতীরা প্রায়শই গুণহীন। গুণবতীরা প্রায়শই রূপবতী না।
নির্মল অপলক চেয়ে বললো, আপনি গুণবতী নন?
শ্বেতা বললো, আপনি তো নাছোড়-যুবক। শুধু কথা বাড়ান।
চলে যেতে যেতে আর একবার পিছনে ফিরে শ্বেতা বললো, মনে রাখবেন, রূপের জাজ্জ্বল্য কমেই, গুণের ঔজ্জ্বল্য বাড়েই।
শ্বেতা মিষ্টি হেসে নিজের কাজে চলে গেলো। নির্মল শ্বেতার ছন্দময় প্রস্থান প্রত্যক্ষ করলো।

ওদিকে নজরুল নারায়ণকে বললো, নারায়ণ বাবু, কর্মই কি সব? কর্মে ডুবে থাকেন, অফিসে যে একজন হিন্দু কলিগ এসেছেন, পরিচিত হয়ে ভাব জমাতে তো পারেন! আপনার সাথে মানাবে ভালো।
নারায়ণ বললো, অনাবশ্যক ব্যাপারে অত্যাবশ্যকতা দেখানোতেই আপনার মহা-আনন্দ?
অপ্রত্যাশিত উত্তর পেয়ে নজরুল থমকে গেলো। তবুও বললো, ভালো কিছু তো আপনার চোখেই পড়ে না! শোনেন, দ্রুততার যুগ। দ্রুত আগুয়ান না হলে অন্য নজোয়ান নিয়ে ভেঙে পড়বেন!
নারায়ণ বললো, শোনেন, ভাগেরটা কেউ নেয় না, পড়ে থাকে। আমার জীবনে যে আসবে সে আসবেই, দুর্যোগ কিংবা মহামারী পেরিয়ে হলেও।
নজরুল বললো, চোখের সামনে হিরা উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে, আপনি আছেন ভবিষ্যতের দোলাচল নিয়ে! সম্মুখ থেকে আহার ছোঁ মেরে চিল নিয়ে গেলে বুঝবেন আফসোস কী?
নারায়ণ বললো, আপনার হাতে অনেক কাজ। আপনি কাজে মন দেন।
নজরুল বললো, ক্ষমতাহীন মানুষকে কেউ সম্মানও করেন না, স্বপ্নেও আঁকেন না। অফিসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন আপনি। শুধু হাত বাড়ান, পেয়ে যাবেন। মেয়েরা তো সুখের পায়রা, সুখি ও স্বচ্ছল বাড়িতেই বসবাস করতে চান। অভাব-অনটনের বাড়ি থেকে পায়রা উড়ে যায়। আপনার অর্থ ও যশ আছে, সুন্দরী মানেই অর্থলোভী, যশস্বী স্বামী চান।
নারায়ণ রেগে বললো, অযাচিত কথা বলে বলে কর্মপরিবেশ নষ্ট করবেন না। আমি মধুও চিনি, স্বর্ণও চিনি, কাচ-তামাও চিনি, আমাকে জ্ঞান দিতে হবে না।

ওদিকে নাদিয়া সদা নাক বাঁকায়। অন্যায় রকম সৌন্দর্যের কারণে শ্বেতাকে মনে মনে গাল পাড়ে, হিংসা করে। এক নারী অন্য নারীকে কারণ ছাড়াই কখনো সহ্য করতে পারে না। আর এক সুন্দরী তো অন্য সুন্দরীকে সহ্যই করে না। আর যখন এক সুন্দরী অন্য সুন্দরীর কারণে গণনায় অগণ্য হয়ে উঠে তখন তো প্রবল হিংসার জন্ম হয়ই। অফিসের কলিগদের তার প্রতি আর নজর আগের মতো পড়ে না। কলিগদের কাছে তার গুরুত্ব যেন কমে যাচ্ছে, মোড় বাঁকিয়ে গুরুত্ব এখন শ্বেতার দিকে ধাবিত। মানুষ যতই সুন্দর হোক দেখতে দেখতে চোখের তৃপ্তি কমতে থাকে। নতুন কিছু দেখলে তাতেই তৃপ্তি বেশি পায়। মানুষ বৈচিত্র্যে বেশি আনন্দিত হয়, সম্মুখে থাকতে থাকতে স্বর্ণও স্বর্ণালী রং হারায়। ভালো লাগার শরীরে মরীচিকা পড়ে, ভালো লাগার সংজ্ঞা পরিবর্তন হয়ে যায়। নতুনের প্রতি চিত্ত বেশি আকর্ষিত হয়। নজরুল নাদিয়াকে বললো, টপ টু বটম কেমন সাজগোজ করেন শ্বেতা ম্যাম। স্বর্গ থেকে দেবী এসেছেন আমাদের অফিসে।
নাদিয়া খুব রেগে গেলো। এমনিতেই শ্বেতার প্রতি মহাহিংসা তার। আবার তার প্রশংসা শুনে ক্ষোভে নাদিয়া ফুঁসলো। নাদিয়া রাগ বুঝতে না দিয়ে বললো, তিনি সুন্দর তা দেখানোর কী আছে! যা সুন্দর তা দেখানোর কিছু নেই, সুন্দর প্রকাশ পায়-ই। মনে রাখবেন, যে যত সুন্দর তার ভেতর তত সমস্যা! ওদের দশটা প্রেম করেও মন ভরে না, দশ স্বামীর ঘরে যেয়েও ঘর বাঁধতে জানে না। সুন্দর চেহারার মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতারক হয়। পুরুষ নাচিয়ে বেড়ায়, রূপ ভাঙিয়ে তহবিল গড়ে। আর ওদের মন ভরে না কখনো, না অর্থে, না স্বর্ণে।
নজরুল বললো, আমার মনে হয় শ্বেতা ম্যাম অনেক ভালো। পোষাক-পরিচ্ছদে শালীনতার আভিজাত্য। ব্যবহারেও আভিজাত্য বিরাজমান।
নাদিয়া আরো রেগে বললো, উপর দিয়ে যে যত সুন্দর, ভেতর দিয়ে সে তত অসুন্দর। খোঁজ নিয়ে দেখেন তাঁর কোনো অনুভূতিই নেই পুরুষদের ঘঁষা খেতে খেতে।
নজরুল বললো, কী বলেন এসব? শ্বেতা ম্যামকে হিংসা করছেন কেন?
নাদিয়া জ্ঞান দেওয়ার মতো করে বললো, মনে রাখবেন, সৌন্দর্য শরীরে না, সৌন্দর্য মনে। সৌন্দর্যকে যারা সম্বল করে, ধরে নেবেন অহংকারী, সংসারী না। সুন্দরীরা ঘর পায়, ঘরনি হতে হতে পৌঢ়া হয়ে যায়।

নাদিয়ার কাছ থেকেও অপ্রত্যাশিত উত্তর শুনে নজরুল মনে মনে মার খেলো। রাতে নির্মল শ্বেতাকে কল দিলো। রিসিভ করার পূর্বে শ্বেতা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। নির্মল বললো, আজ রাতের আকাশটা দেখেছেন?
শ্বেতা বিস্ময়ের ছলে বললো, আজ তো আকাশে চাঁদ নেই! তাই জ্যোৎস্না মেখে পরিরাও স্নান করছে না। কী দেখবো? মায়াময় চাঁদই যদি না থাকে আকাশে, রাতের আকাশের কি দেখার থাকতে পারে! চাঁদ দেখার মতো তো তারা দেখে দেখে আশ্চর্য হওয়া যায় না।

নির্মল এক প্রকার ধরা খেলো। অপর জনের সহযোগিতা না পেলে গল্প এগোনাে যায় না। নির্মল কথা ঘুরিয়ে বললো, দেখেন, আকাশ এক বুক তারা নিয়ে ঘুমিয়ে। তারাদের মেলা বসেছে আজ। তারাদের চোখে ঘুম নেই ।
শ্বেতা তারা দেখার জন্য বাইরে গেলো না। বললো, চাঁদ না উঠলে রাত মায়াবী হয় না।
নির্মল বললো, কিন্তু আমার মনের আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে জ্যোৎস্না। আপনার সাথে কথা বলছি যে…
শ্বেতা হেসে বললো, এত উৎফুল্ল হবেন না। আমৃত্যু মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করেও একে অপরকে চিনে উঠে না। কাউকে দেখে, একদিন দুইদিন কথা বলে চেনা যায় না।
নির্মল বললো, একদিন দুইদিনে চেনা না গেলে কখনোই আর চেনা হয়ে উঠে না। মানুষ মানুষ চিনতে দেরি করে না, ভুলও করে না। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অন্তর্লোক উদ্ধার করা যায়। অন্তরতলের অতল রহস্যও উদঘাটন করা যায়।
শ্বেতা বিরক্তির স্বরে বললো, আপনি আকাশের তারা দেখেন, তারা গণনা করেন, তারাদের নাম দিতে থাকেন। আমি রাখি।
নির্মল টুক করে কথা ঘুরিয়ে নিলো। বললো, আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়ছিলাম। আসলে একনিষ্ঠ চিত্ত না হলে রবীন্দ্রনাথ পড়ে কিছু উদ্ধার করা যায় না। অস্থির চিত্তমনাদের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা নয়।
শ্বেতা বিরক্তির ঢঙে বললো, আপনার চিত্ত একনিষ্ঠ নেই কেন? কার জন্য এত অস্থির হয়ে থাকেন শুনি?
নির্মল বললো, জীবনের ভুলগুলি অঙ্কের খাতার ভুল হলে রাবার দিয়ে মুছে সংশোধন করা যেত।
শ্বেতার অনাগ্রহ থাকলেও জানতে চাইলো, কী এমন মহাভুল করেছেন যে এত খেশারত দিচ্ছেন?
নির্মল বললো, শুধু অব্যক্ততার কারণে আজ আমার যত অপ্রাপ্তি। আমি পারি না আমার চাওয়াগুলোকে উপস্থাপন করতে। আমার চাওয়া সসীম, কিন্তু আমি যা হারিয়েছি তা আমার অসীম চাওয়ার ফল ছিলো। যদি বলেন, আপনার সঞ্চয় কী? আমি বলবো, আমার জীবনের যোগ-বিয়োগের ফল শূন্য।
শ্বেতা বললো, আশাহত হতে নেই। প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে আশাকে জাগিয়ে রাখতে হয়। নিবিড়চিত্তে যদি আপনি কাউকে কামনা করেন কালের চাকা ঘুরে নতুন কাল এলেও আপনি তাকে পাবেন। আচ্ছা, আপনার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ আছে?
নির্মল বললো, আছে। দুই বার পড়েছি।
শ্বেতা বললো, দিয়েন তো। খুব নাম করা উপন্যাস। আমার অবশ্য পড়া হয়নি।

পরের দিন সবাই অফিসে এসেছে। নির্মল এসেছে দেরি করে, কারণ বাজার থেকে সে ‘শেষের কবিতা’ কিনেছে শ্বেতাকে দেবে বলে। ঘরে তো তার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো বই-ই নেই। শ্বেতাকে সে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি দিলো। কথা হলো না, কিন্তু চোখেতে চোখ পড়ায় দুইজনই হেসেছে। যেন দুইজন দুইজনের কত কাল আগে থেকে পরিচিত। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কর্মকর্তারা আলোচনা না করলে অস্বস্তি লাগে। হুমায়ুন কবীর এক মনে বলেই চলছেন, নিজেকে এত জ্ঞানী মনে করেন যাকে সামনে পান তাকেই জ্ঞান দেন। সামনে কেউ না থাকলে একা একা বকেন। আর অন্যায্য ব্যাপারে অনন্য ভূমিকা রাখেন সব সময়।
নাদিয়া বললো, নিশ্চয় নজরুল সাহেবের কথা বলছেন? উনার নির্বুদ্ধিতা আর বোকামিতে বিশিষ্টতা আছে। আগ বাড়িয়ে কথা বলার স্বভাব। অতিশয় অতিরঞ্জিত উক্তিতে অতি পাকা। বুড়ো মানুষের ছেলেমানুষী অসহ্য লাগে।
নারায়ণ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো, অন্যকে সেবা করার, লালন করার, উপকার করার প্রবল ক্ষুধা আছে অন্তরে। কেউ উনার সাহায্য গ্রহণ না করলেও সাহায্য করেই ছাড়বেন। পরকে সুখ দেওয়া, পরকে নিশ্চিন্ত রাখা, পরকে আপন করা, পরের সংকট নিরসন করায় যেন উনার কাজ! এত ধিক্কৃত হন, তবুও লজ্জা হয় না।
হুমায়ুন কবীর বললো, আত্ম-সমীক্ষার মধ্য দিয়ে আসে বিবেচনাবোধ। নজরুল সাহেব নিজেকে কখনোই ভাবেননি। যাকে তাকে যা তা বলবেন। নিজেকে আঁতেল পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছেন। মানুষ নিজের সম্মান নিজের কর্মগুণেই হারিয়ে ফেলেন।
নারায়ণ বললো, ঠিকই, আত্ম-দর্শনে খোলে আত্মার সিংহদরজা। অন্য আমাকে কী বলছেন যদি তাতে কান না দিই তবে কান না থাকায় ভালো। নাককাটা। আমি কী বলছি আমি তা নই, মানুষ আমাকে কী বলছে আমি তাই।
নাদিয়া বললো, উনার অনুভূতিই নেই। বোধ-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। দেখা-বোঝার শিকড়-বাকড় শুকিয়ে গিয়েছে।
শ্বেতা নারায়ণকে একটা ফাইল দিতে এসে বললো, সবার মুখ ভার! ভারী ভারী কথা হচ্ছে নিশ্চয়? জ্ঞানীদের সম্মেলন অফিসটি। ভারী ভারী কথায় ভারাক্রান্ত আমি। অদৃষ্টের রুদ্রলীলায় আমি ভরা গাঙে এসে পড়েছি।
হুমায়ুন কবীর বললো, ভারি মজা করে কথা বলেন শ্বেতা ম্যাম। ম্যামের হাসিমাখা কণ্ঠের কাকলিতে চমকে যাই।
মুখ ভেংচি কেটে নাদিয়া বললো, হাসি তো না কালবৈশাখির ঝড়। কলিগদের হৃদয় সাগর লণ্ডভণ্ড করে দিলো।
কথাটি শুনতেই শ্বেতা থমকে গেলো। বললো, আমি কি আমার অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি, ম্যাম?
নাদিয়া বললো, না, না, কষ্ট দেবেন কেন? যে জাদু-মায়া আপনার দখলে কেউ কষ্ট পেতেই পারেন না।
শ্বেতা অসন্তুষ্টচিত্তে চলে গেলো। হুমায়ুন কবীর বললো, নাদিয়া ম্যাম, শ্বেতা ম্যামকে এভাবে কথা বললেন কেন?
নাদিয়া বললো, শ্বেতা ম্যামের রূপে তো আপনি নিমজ্জিত, তাঁকে নিয়ে কিছু বললে তো আপনার বাঁধবেই। আগুনে মুগ্ধ হলে ফাগুনে উচ্ছ্বসিত হবে কে? জলে ডুবলে বায়ুতে উড্ডীন হবে কে? বৈশাখী ঝড়েই তো আপনার বুক ভেঙেছে বাসন্তী পবন গায়ে মাখবেন না? আলো ঝলমলেতে তাক লাগে, কিন্তু আপন নিভৃত ঘর থেকে সুন্দর না।
হুমায়ুন কবীর বিস্মিত হয়ে নাদিয়ার কথা শুনলো। নারায়ণও মুগ্ধ হয়ে শুনলো আর বললো, নাদিয়া ম্যামের বিশ্লেষণ যথার্থ। লাবণ্য ত্বকের নারীকে সামলানো কষ্ট। এত ভুল করেন, বকতে চেয়েও বকতে পারি না। হেসে দেন, হেসে দিই।
নাদিয়া রেগে বললো, আমরা ভুল করলে অন্যায়, শ্বেতা ম্যাম ভুল করলে ভুলই। আমরা ভুল করলে জবাবদিহিতা, শ্বেতা ম্যাম ভুল করলে নমনীয় ভাবধারা প্রকাশ।
নারায়ণ বললো, সব সময় কঠোর হলে কাজ উদ্ধার করা যায় না।
নাদিয়া তীর্যক চোখে চেয়ে বললো, রূপের ফাঁদে পা দিয়েন না, রূপের কবলে পড়লে দেবী দেবালয় ছেড়ে আপনার আলয়ে এসে উঠবে কিন্তু!
নারায়ণ রাগ করে বললো, আপনিও তো নজরুল সাহেবের মতো কথা বললেন। বিয়ে না হয় করিনি, তাই বলে যাকে তাকে বিয়ে করবো? যাকে বিয়ে করবো তাকে শিক্ষিত, চাকরীজীবী, রূপবতী হতে হবে এমন নয়। অধস্তনকে বিয়ে করলে সম্মান নষ্ট হয়। তারচেয়ে আপন কর্মক্ষেত্রের বাইরের অপেক্ষাকৃত গরীব, স্বল্প শিক্ষিতকেও বিয়ে করা যায়। অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্না বৌয়ের কাছে পূজনীয় হয়ে থাকা যায়।

সবাই আবার নিজ কাজে মনোনিবেশ করলো। হঠাৎ শ্বেতার সেটে মেসেজ এলো, নির্মল দিয়েছে। বিরক্তির স্বরে পড়লো, সত্য অনুভূতি প্রকাশ করা সত্যই কঠিন কাজ।
শ্বেতার মন খারাপ। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না। নির্মলের মেসেজের উত্তরে লিখলো, যত কঠিনই হোক সময়ের সাথে সাথে সব সহজ হয়ে যায়।
মেসেজটি পেয়ে নির্মল শ্বেতার দিকে তাকালো। শ্বেতা হেসেই মুখ নামিয়ে কাজ করতে থাকলো। নির্মল আবার মেসেজ দিলো, আচ্ছা, অপ্রকাশ্য কিছু কি থাকে? অপ্রকাশ্য থেকে প্রকাশের কিছুই কি বিচ্ছুরিত হয় না?
বেশক্ষণ ভেবে নিয়ে শ্বেতা উত্তর দিলো, অপ্রকাশ্য কিছুই থাকে না। তবে প্রকাশিত সূর্য কিরণের চেয়ে অপ্রকাশিত সূর্য কিরণের প্রত্যাশাস্বাদ বেশি। তবে যাকে নিয়ে অপ্রকাশ্য, অব্যক্ত ভাব থাকে তার কাছে প্রকাশিত বা ব্যক্ত না হলেও সে বার্তা পৌঁছে যায়!

শ্বেতার কাজে ভুল পেয়েছে অথবা নাদিয়া বলে বলে শ্বেতার বিরুদ্ধে নারায়ণকে হয়তো বিষিয়ে তুলেছে। তাই তো নারায়ণ এসেই শ্বেতাকে বকা দিতে লাগলো, কাজে আপনি অন্যমনস্কা। ফাঁকি দিতে হলে ফাঁক খুঁজতে হয়, চতুর হলে চাতুরী করা যায়, চুরি করা যায়।
নারায়ণের উচ্চ বাক্যে সবাই চক্বিত হলো। গ্রাম্য অঞ্চলে ঝগড়া-বিবাদের সময় রাগান্বিত পুরুষের মতো নারায়ণের কর্কশ কণ্ঠ। নির্মল উঠে এলো। রেগে বললো, আপনি ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করেছেন। শ্বেতা ম্যাম অফিসে নতুন। ভুল হতেই পারে। তাই বলে যা ইচ্ছে তাই বলা আপনার বাড়াবাড়ি। নিতাই স্যারকে আপনি রিপোর্ট করতে পারতেন।
নারায়ণ বললো, উনি নিয়মিত ভুল করছেন। উদাসীন আর উদভ্রান্ত মনের মানুষ। ক্লাস রুম নয় যে উদাসীন হয়ে থাকবেন। ভুল করাই উনার স্বভাব। একটু ভুল অনেক গরমিলের কারণ। বারবার ভুলের বারবার ক্ষমা হয় না। ভুলোমনে ভুল হবেই। এক কাজের সাথে হরেক কাজ করতে গেলে সেটাকে কাজ বলে না, অকাজ বলে। অকাজ আমি ক্ষমা করবো, কুকাজ না।
নির্মল আরো রেগে বললো, আপনি অকাজ থেকে কুকাজ পর্যন্ত চলে গেলেন? বলুন, তিনি কখন অকাজ করলেন, কখন কুকাজ করলেন? আপনাকে সুবিবেচক হিসেবেই জানি, অবিবেচকের মতো কথা কখনো বলবেন না।
নারায়ণ বেশি কথা বাড়িয়ে অফিসের পরিবেশ নষ্ট করলো না, নিজ ডেস্কে চলে গেলো।

অফিসটা বেশ ভারী হয়ে গেলো। খুব মন খারাপ শ্বেতার। এমন উচ্চারণ জীবনে শোনেনি। শ্বেতা বুঝতে পারলো বাস্তব জীবন এমন, কাজ ছাড়া প্রশংসা পাওয়া যায় না। এটাও বুঝলো, উর্ধ্বতনকে খুশি করে রাখাও কাজের বড়ো একটা অংশ। কাজ পাগল মানুষগুলো অবসর সময় ছাড়া রূপের দিকে নজর দেয় না।

সেদিনের পর থেকে সমস্যায় পড়লেই নারায়ণের কাছে যায় শ্বেতা। শ্বেতা অপরাধের সুরে বললো, স্যার বিশ্বাস করুন, আমি খুব চেষ্টা করি। আমার আন্তরিকতার অভাব নেই। বুঝে উঠতে সময় লাগে। আমার কোনো ভুলই ইচ্ছাকৃত নয়।
নারায়ণ নরম সুরে বললো, সবাই সব বোঝেনও না। সবাই সব শিখে জন্ম গ্রহণ করেনও না। আর ভুল একটা স্বাভাবিক বিষয়। আমি চাই, আপনি মনোযোগী হবেন। মনোযোগ দেবেন। দেখবেন আপনার বিরুদ্ধে আর কোনো অনুযোগ, অভিযোগ থাকবে না।
বলেই নারায়ণ শ্বেতার মুখের দিকে তাকালো। শ্বেতা ভাবনার চেয়েও মধুর, মধুরতর। চোখ দুটো লেগে গিয়েছে চোখের কণিকায়। শ্বেতার মুখে লাজুক রঙের আভা। একটি অনিন্দ্য হাসি দিয়ে চলে গেলো। একমুঠো টাটকা বাতাস বয়ে গেলো।

নারায়ণের সাথে শ্বেতার বেশ সখ্যতা বা আন্তরিকতা গড়ে উঠলো। নজরুল সব পর্যবেক্ষণ করে। তাই বললো, নারায়ণ বাবু, আপনার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। বিশেষ কৌশলে বিশাল সফলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন বৈকি! ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসা পেতে দেখেছি এতকাল। শাসন আর ধমক দিয়ে ভালোবাসা পাওয়ার দৃশ্য এই প্রথম দেখলাম। বড়ো মাথার বড়ো বুদ্ধি। উর্বর মাথা থেকে উর্বর বুদ্ধিরই জন্ম হয়।
নারায়ণ নজরুলের কুমতলব বুঝতে পেরেছে। তাই বললো, আপনি একটা গাধা, সব ময়লা গায়ে মাখেন। হাস দেখেন না? ময়লা কাদা ঘাটলেও শরীর পরিষ্কার রাখে।
নজরুল বললো, আমাকে যা-ই বলেন না কেন, শ্বেতা ম্যামকে আপনার মনে ধরেছে, বুঝে ফেলেছি। অস্বীকারের কিছু নেই তো!
নারায়ণ বললো, আপনার শরীর যন্ত্রের বিকার তো অনেক আগেই হয়েছে, এবার হৃদয় যন্ত্রের বিকার হয়েছে।
নজরুল বললো, আমাকে যত পারেন তত বকেন। কিন্তু সত্যটা হলো, আপনি শেষ। চোখ মেলে আপনি এখন যত না দেখেন চোখ বন্ধ করে আপনি এখন তারচেয়ে বেশি দেখেন। আপনার না বলা কথার মধ্যেও অনেক বলা কথা লুকিয়ে। শ্বেতা ম্যামের রূপের আলোর বৈভবে আপনার ভুবন রেঙে রঙিন হয়ে উঠেছে।

বলেই নজরুল হাসতে লাগলো। অসহ্য লাগলো নারায়ণের। বললো, রামের ধনুক সহ্য হয়, আপনার মতো হনুমানসদৃশের দাঁত মিচকিনি সহ্য হয় না।
নজরুল এ অপমানে অপমানিত না হয়ে বললো, দেবীর পূজাতে লেগে যান। দেখেন কোন ফুল-ফল ভালোবাসেন, কোন পত্র-পল্লবে নারাজী। কোন বাদ্যে ধন-সম্পদ বর্ষণ করেন!

নির্মল অসংখ্য মেসেজ দিলো, কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর পেলো না। বিষণ্নে মনটা ভরে গেলো। বারবার তাকাচ্ছে, কিন্তু শ্বেতা মাথা নিচু করে কাজ করছে। অফিস শেষে যে যার মতো বাড়ি চলে গেলো। রাতে শ্বেতা কল দিলো। বললো, আমরা একটা নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে আছি। অফিস চলাকালীন সময়ে মেসেজ দেবেন না। আমার অন্যান্য কলিগরা তো এমনটা করেন না! কাজে সহযোগিতা করেন বলে কি কাজে ব্যাঘাতও করবেন?

শ্বেতা কল কেটে দিলো। বিষণ্নতায় নির্মলের মুখটা ফিকে হয়ে গেলো। নির্মল ভাবলো, আসলেই বাড়াবাড়ি করেছি। সুন্দরীর সৌন্দর্য দর্শনে যত বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়া যায়, তার মুখনিঃসৃত কটাক্ষাচ্চারণে তারচেয়েও বেশি ক্ষত-জর্জরিত হতে হয়।

বেশ রাতে শ্বেতা আবার ফোন দিলো। ক্ষমা, অনুশোচনা আর অনুতাপ প্রকাশ করছে সে। নির্মল বললো, আপনি নারায়ণ স্যারের সাথে এত মেশেন কেন?
শ্বেতা বললো, বড়ো স্যার। ম্যাচিউর। হ্যান্ড হচ্ছে বলের শক্তি, হেড হচ্ছে বুদ্ধির শক্তি, হার্ট হচ্ছে ভালোবাসার শক্তি। তিনটিই উনার ভেতর বর্তমান।
নির্মল চুপ হয়ে থাকলো। শ্বেতা বললো, কথা বলছেন না কেন? আমি অবশ্য এমন ম্যাচিউর ছেলেদের পছন্দ করি না। ওমন গুরুগম্ভীর, রাশভারী লোক মোটেও আমার ভালো লাগে না। উনাদের সময়ের অনেক দাম। ব্যস্ততার মধ্য থেকে সময় বের করতে পারলেও সময় দিতে চান না। ওমন মানুষকে নিয়ে সংসারও করা যাবে না। কাজের অজুহাত দেখিয়ে শুধু চলে যাবেন। আমার পছন্দ পাগল পাগল টাইপের ছেলে। যার শিশুসুলভ আচরণ সবসময় থাকবে। আমার অসহ্য রকমের প্যাচাল শুনবে রাতদিন। ঐ ছেলেই আমার পছন্দ যে, প্রগলভ টাইপের, শুধু বলবে ভালোবাসি ভালোবাসি।
নির্মল মন দিয়ে কথাগুলো শুনলো। তারপর বললো, নারায়ণ স্যারের সাথে মিশবেন না।
শ্বেতা বললো, আমি কার সাথে মিশবো, কার সাথে মিশবো না, এটা কিন্তু একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার স্বাধীনতায় আপনার মতামত প্রকাশ কিন্তু অনধিকার চর্চা। এটা মনে রাখবেন আমি ভালোও বুঝি, মন্দও বুঝি। মানুষও চিনি, অমানুষও চিনি। কেউ ইট মারলে পাটকেলও মারতে জানি। কেউ গরল দিলে ঘোল তাকে ঠিকই খাওয়াবো।

নির্মল কল কেটে দিলো। খুব খারাপ লাগছে তার। ভাবতে লাগলো, মনের গভীর এক কোণে তোমায় রেখেছি সযতনে, তুমি বুঝতে পারো না? নয়নের গভীরে যে স্বপ্ন আঁকা তা তোমাকে ঘিরে, তুমি কি বোঝো না? তুমি দূর আকাশের কল্পনাতেই থেকে যাবে কি? এতটুকুও কি আমার জন্য মনে ভাবনা জাগে না?
তখনই শ্বেতা আবার ফোন দিলো। বললো, ভদ্রতার ফাঁকে মানুষ দুর্বলতা খোঁজে। এটা কি ঠিক?
নির্মল চুপ থাকে। শ্বেতা আবার বললো, ইনিয়ে-বিনিয়ে অপছন্দের মানুষ অনুষঙ্গ কামনা করলে কেমন লাগে বলুন তো?
নির্মল এবার বললো, সংযত হলে সব সামলানো সম্ভব। সাবধান থাকলে শত প্রতিকূলও জয় করা সম্ভব। শত বিপদ মাঝে স্মরণ করবেন, সহযোগিতা পাবেন।
শ্বেতা বললো, সহযোগিতা দেবে এ অজুহাতেই তো মানুষ সুযোগ খোঁজে। কাছে ঘেঁষে।
নির্মল ইঙ্গিত নিজের ঘাড়ে নিয়ে চুপ হয়ে গেলো। শ্বেতা বিষয়টি সুদৃঢ়ভাবে বুঝতে পারলো। তারপর বললো, সবার সব গুণ ভালো লাগে না। আপনার কিছু গুণ আমার ভালো লাগে। যে কারণে আপনাকে ভীষণ বিশ্বাস করি। বলতে পারেন আপনাকে আলাদা চোখেও দেখি।
শুনে নির্মলের মন ভালো হয়ে গেলো। মেয়ে মানুষের কথার কী মহিমা, তার এক মিষ্টি কথাতে যাবতীয় জীবন যাপনে সুখের বারিধারা বয়, আর একটি তীর্যক বচনে যাবতীয় জীবন যাপনে কষ্টের অগ্নিধারা বয়।
নির্মল ভাবলো, সকল সুন্দরী অনর্থক অহংকারী আর অবিবেচক হয় না। সকল সুন্দরী হৃদয় ভাঙার ব্যবসায় করে না।
মধুর কষ্টের শেষ হলো। বললো, কাল তো শুক্রবার। চলুন বাইরে কোথাও ঘুরতে যাই…
শ্বেতা নির্মলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো, আসলে আমি সারা সপ্তাহ পরিকল্পনা করেছি শুক্রবারটা বাসায় নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু কাজ করবো।

নির্মল চুপসে গেলো। জোরারোপ করলো না। জোরারোপ করার জন্য অধিকার থাকতে হয়। কোন অধিকারে সে জোরারোপ করবে! ভাবলো, সুন্দরীদের মনের নাগাল পাওয়া সাধারণ মানুষের সহজসাধ্য কাজ নয়। সত্যই, সত্য মনের নাগাল না পেলে এক ডাকে কেউ কখনো বাইরে ঘুরতে যাবে না। লোভনীয় বাদাম, আইসক্রিম বা ফুচকায় প্রলোভিত হবে না। মনের সাথে মনের জোড়া না লাগলে হাতে অঢেল সময় থাকলেও সময় নেই অজুহাতে বের হবে না।

পরদিন সবাই কর্মক্ষেত্রে হাজির হলো। একটু পরেই শ্বেতা নারায়ণ বাবুর কাছে গেলো। কাজ বুঝে নিতে বা সমস্যা সমাধানে বা কাজ বুঝিয়ে দিতে। কিছুক্ষণ পরে নিজের ডেস্কে বসতেই নির্মল মেসেজ দিলো। যদিও শ্বেতা মেসেজ দিতে নিষেধ করেছিলো, তবুও নির্মলের থেকে মেসেজ পেয়ে বিরক্ত হলো না। ও পড়লো, আমি কি সমস্যার সমাধান করে দিতে পারি না?
উত্তরে শ্বেতা লিখলো, আপনি দূরত্ব বোঝেন না। কানের সাথে লেপ্টে সাহায্য করেন। আমার চুলের গন্ধ সব শুষে নেন।
শ্বেতার মেসেজ পড়ে নির্মল আনমনা হয়ে পড়লো। শ্বেতা বেশক্ষণ ধরে লিখে বড়ো একটা মেসেজ দিলো, একদিন নাদিয়া ম্যাম আমার সাথে দুর্ব্যবহার করেন। সামনে নারায়ণ স্যার ও হুমায়ুন স্যার ছিলেন। দেখে মজা নিচ্ছিলেন! আর একদিন নারায়ণ স্যার আমাকে চরমভাবে বকা দেন। অফিস ভর্তি কেউ আমার পক্ষে দাঁড়াননি। একজন প্রতিবাদ করেছিলেন, আমার চোখে তিনি আলাদা, স্পেশাল।

অফিসের বড়োকর্তা নিতাই বাবু। বড়ো কড়া লোক। বড়ো লোকের শত্রুর সংখ্যা ঢের বেশি। তাঁর শাসনে কখনো শৈথিল্য দেখা যায় না। অফিসের শিরোভূষণ সাধারণ কর্মকর্তাদের সংস্রব মাখেন না। শ্বেতা ডাক পেয়েছে। নির্মলকে মেসেজ দিলো, স্যার ডেকেছেন। স্যার নাকি প্রচণ্ড রাগী?
নির্মল মেসেজে লিখলো, অসামান্য প্রতিভাধর ব্যক্তিদের সামান্য কথাও ভক্তি সহকারে শুনতে হয়। যিনি যত ভয়ংকর তাঁর ভেতরটা তত কোমল। পুরুষের পুরুষালীতে প্রকৃত পরিচয়। তাতে দোষ দেখতে নেই।
নির্ভয় পেয়ে শ্বেতা বড়োবাবুর রুমে গেলো। আর নির্মল ভাবলো, শরৎকালে সরিয়ে রাখে, বিপদকালে অবলম্বন করে!
বেশক্ষণ হয়ে গেলো শ্বেতা বড়োবাবুর রুমে। নিতাই বাবু হরেক কথা বলছেন। কাজের কথার ফাঁকে ফাঁকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক কথাও জানছেন। এমন পরমা সুন্দরী সামনে থাকলে কার না মন চায় দুটো মিনিট বেশি কথা বলতে!
শ্বেতা ফিরে এলে নির্মল মেসেজ দিলো, স্যার কী বললেন?
শ্বেতা মিষ্টি হেসে মেসেজ দিলো, বলেছেন, আমার কানের দুলে, নাকের নাকফুলে, গলার চেনে, আঙুলের আংটিতে, কপালের টিকলিতে কখনো সোনা কম পড়বে না!
নির্মলের হাত থেকে কলম পড়ে গেলো। মুখ তুলে শ্বেতার দিকে তাকালো। শ্বেতা মিষ্টি হেসে মুখ নামিয়ে নিলো। মিষ্টি হাসির রহস্য বুঝতেই পারলো না নির্মল।

পরদিন বড়োবাবু আবারও শ্বেতাকে ডেকেছেন। শ্বেতা আজ নির্ভয়ে স্যারের রুমে গেলো। ভাবগতি ধরা গেলে মোকাবেলা করা সহজ সে জানে। নিতাই বাবু বললেন, অফিস টাইমে নির্মল বা নারায়ণ বাবু কারো সাথে অতি আন্তরিকতার দরকার নেই।
বিমর্ষ হয়ে শ্বেতা ফিরে এলো। নির্মল মেসেজ দিতেই শ্বেতা উঠে নির্মলের কাছে এসে বললো, আপনি কি চান না জবটা আমি করি?
অপ্রত্যাশিত আচরণ পেয়ে নির্মল থমকে গেলো। শ্বেতা বললো, আত্মীয় স্বজন দ্বারা, পথের পথিক দ্বারা, সহপাঠীদের দ্বারা, কলিগ দ্বারা উত্যক্তের শিকার হচ্ছি, কত সহ্য করা যায় বলেন? এত বিরক্তি, এত বাধা, এত ভয় নিয়ে তো জীবন নির্বাহ করা যায় না!

মহিউদ্দিন আর নির্মল একসাথে বাসা ভাড়া করে থাকে। সময় পেলে গুরুত্বপূর্ণ অগুরুত্বপূর্ণ অনেক কথা তাদের মাঝে হয়। ওদিন রাতেই মহিউদ্দিন নির্মলকে ধরলো। বললো, শ্বেতা ম্যাম শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক অনন্য অসাধারণ প্রতিমা। মানুষ এত অসহ্য রকম, অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর হতে পারেন জানা ছিলো না। সব নারীর ভেতরে কিন্তু শাশ্বত নারীর রূপ থাকে না। যেভাবে অগ্রসর হচ্ছেন তাকে বলা চলে শম্বুকগতি। কোনো বাজপাখি উড়ে এসে না আবার তাঁর মনের জমিন দখল করে নেন। ম্যামকে শুধু মেসেজ দিয়ে দখলে আনতে পারবেন?
নির্মল বললো, শম্বুকগতিতে অগ্রসর হলে কিছু কিছু কাজের ফল অত্যন্ত মিষ্টি হয়।
মহিউদ্দিন বললো, শ্বেতা ম্যামের পাশে বসার কারণে ম্যামের সাথে আমার বোঝাপড়া ভালো। আপনার হয়ে আমি কি একটু ওকালতি করবো?
হ্যাঁ না অনুমতি পাওয়ার আগেই নির্মলের সেটে কল এলো শ্বেতার। মহিউদ্দিন থেকে নির্মল সরে বাইরে গেলো। শ্বেতা বললো, কেমন একটা ভয় আমাকে চেপে ধরেছে! আমি এখন শঙ্কিত থাকি। চিন্তিত থাকি। আমি প্রত্যাখ্যান করতে করতে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গিয়েছি। আমি বড়ো একা হয়ে পড়েছি।
নির্মল আগ্রহ সহকারে বললো, কী হয়েছে আপনার? হঠাৎ এমন বাক্য শুনে আমারও তো খারাপ লাগছে।
শ্বেতা বললো, ছোটোবেলা থেকে প্রশংসা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। প্রশংসা শুনলে আমার ভালো লাগতো। এখন ভয় করে, ভীষণ ভয় করে। আজ অফিসে রাগের মাথায় অনেক কথা বলে ফেলেছি, কিছু মনে করবেন না। আমাকে মানিয়ে নিতে শেখেন, কাজ দেবে।
এভাবে ওরা বেশ রাত পর্যন্ত কথা বললো।

পরদিন অফিসে যে যার ডেস্কে বসে কাজে লেগে গেলো। মহিউদ্দিন মজাচ্ছলে বললো, ম্যাম, পরম শান্তিপূর্ণ দুর্লভ সুখ মানুষ কখন পায় জানেন? সংসার জীবনে! আর সে সংসারে একটা সন্তান থাকলে তো স্বর্গ বিরাজ করে!
শ্বেতা মিষ্টি হেসে বললো, শতাব্দীর সেরা কৃষ্ণ চাই না। চাই না সুবেশসুন্দর কার্তিক। প্রগলভ টাইপের কেউ এসে যদি বলতো ‘ভালোবাসি’। বলেই দিতাম তাকে ভালোবাসি।
মহিউদ্দিন বললো, রান্না করতে জানেন তো? বৌয়ের হাতের রান্না কিন্তু স্বামী সমাজ গপাস গপাস করে খায়।
শ্বেতা হেসে বললো, তরকারি কুটতে পারি না, তরকারি রান্নাও জানি না। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির গঞ্জণা শুনে মরতে হবে আমাকে।
মহিউদ্দিন পাণ্ডিত্য ফলাতে ফলাতে বললো, গাইতে গাইতে গায়েন। কোনো মেয়েই মায়ের ঘরে ঠিক করে রান্না শেখে না। স্বামীর ঘরে এসেই রাধুনি হয়ে উঠে। সফল কর্মকর্তার পাশাপাশি আপনাকে কিন্তু সফল রাধুনিও হতে হবে।

শুনে শ্বেতা হাসলো। মহিউদ্দিন আবার বললো, এ জীবন কিছুই নয়, বুদবুদ। বাতাসে একদিন মিলে যাবে। মানুষ প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির জন্য নেশায় মত্ত থাকে। প্রকৃত প্রতিষ্ঠা জীবনে কখনোই আসে না। সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। অনেক অপ্রাপ্তি থাকলেও প্রাপ্তির সংখ্যাও কম থাকবে না।
শ্বেতা বললো, মানুষ কেবল প্রশংসা করেন। কেউ তো প্রকৃত ভাবে অনুভূতিতে এসে ধাক্কা দিলেন না। কেউ তো কোনো দিন এসে জিজ্ঞাসা করলেন না -কী ভাবছি! কেউ তো এমন স্বপ্ন দেখালেন না, বিকেলের সূর্যকে কর্জ করে এনে কপালের টিপ করে দেবেন!
মহিউদ্দিন বললো, দেখুন, চাওয়া মাত্রই প্রত্যাশিত জিনিস পাওয়া যায় না। কেউ একজন আপনাকে খুব ভালোবাসবে, ভালোবেসে সে নিঃস্ব হবে, ভালোবেসে আপনাকে ধন্য করবে, ঋণী করবে, এত ভাবাও ঠিক না।
শ্বেতা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, তা ঠিক। খুব বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক না। আচ্ছা দেখি, আমার প্রত্যাশার ডালপালাগুলোকে ছাটতে পারি কিনা!

অফিস শেষে নির্মল অপেক্ষা করলো শ্বেতার জন্য। শ্বেতা কারো কাছে না যেয়ে নির্মলের কাছেই এলো। শ্বেতা আর নির্মল আজই প্রথম একসাথে হাঁটছে। কে কীভাবে এবং কী বিষয়ে কথা বলবে বুঝতে পারছে না। এভাবে বেশদূর ওরা চলে গেলো। তারপর দুইজন দুইজনের দিকে চেয়ে হেসে দিলো। শ্বেতা হাসি নিয়ন্ত্রণ করে বললো, কিছু বলবেন না?
নির্মল বললো, রূপের প্রশংসা করলে তো ভয় জাগবে। এটা সত্য আপনার সৌন্দর্য দেখার আনন্দ আমার সবচেয়ে বড়ো আনন্দের।
মিটমিট হেসে শ্বেতা বললো, কখন সৌন্দর্য দেখেন? কোনোদিন তো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারলেন না! নারায়ণ স্যার তো ঠিকই চোখের দিকে চেয়ে কথাও বলেন, বিস্ময়ে বুদ হয়ে যান।
নির্মল মাটির দিকে চেয়ে থাকে। শ্বেতা বললো, বড়োবাবু মধ্যরাতে কল করেন!
নির্মল কথাটি শুনেই বিদ্যুৎবেগে শ্বেতার দিকে তাকালো আর বললো, মানে? কী বলেন?
শ্বেতা দাঁতে ঠোঁট কেটে নাকে হাসে। আর বলে, খুব মিষ্টি করে কথা বলেন। সাজিয়ে কথা বলেন। উনার মাথার কাঁচা-পাকা চুল আমার খুব পছন্দের।
নির্মল সবই বুঝতে পারলো। একবার ভাবলো, অর্থহীন ব্যক্তির কর্তৃত্ব নেই, আধিপত্য নেই। অফিসের ছোটোকর্তার দিকে কারো কি কখনো নজর যায়? ধন-সম্পদও এক ধরনের শক্তির নিদর্শন। তাছাড়া শ্বেতার সৌন্দর্য সম্ভারের সামনে আমি মূর্তিমান দূর্ভিক্ষফণাক্ষত অস্থিকঙ্কালসার অগণ্য।
শ্বেতা নির্মলের নিষ্প্রভতা প্রত্যক্ষ করলো। বললো, অল্পতে সন্তুষ্টতা মানুষের বড়ো গুণ। কিন্তু অপ্রাপ্তিতে মনকে সন্তুষ্ট করে রাখা যায় না।
নির্মল মনে মনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ভাবলো, আমার জীবন নামক পদ্মবনে মদমত্তহস্তী বারবার এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। জীবনের নাট্যলীলায় আমি এক ব্যর্থ ও ক্লান্ত অভিনেতা। দুঃখ ভোগ, ব্যর্থতা ভোগ আর শোক ভোগ যার সম্বল তার বারবার স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা।
শ্বেতা নির্মলকে সূক্ষ্মভাবে প্রত্যক্ষ করলো। তারপর বললো, বড়োবাবুর ওমন মিষ্টি করে কথা বলা আমার আবার ভালো লাগে না। অত সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলাও আমার ভালো লাগে না। মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলেই মিষ্টি করে, সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলা পুরুষদের এক ধরনের ফ্যাশান। আমার ওসব আদিখ্যেতা ভালো লাগে না।

পরদিন থেকে অফিসে নির্মল আর তেমন উচ্ছ্বসিত থাকে না। শ্বেতা বিষয়টি লক্ষ্য করে মেসেজ দিলো, অন্তরে অভেদ, বাইরে প্রভেদ।
প্রতিউত্তরে নির্মল লিখলো, অন্তর যন্ত্রে শত চেষ্টাতেও আর সুর উঠবে না।
শ্বেতা লিখলো, অব্যক্ততা আপনার বড়ো গুণ। যে আপনার অব্যক্ততা বুঝতে পারেনি সে বড়ো অভাগা।
নির্মল প্রতিউত্তর দিলো না। শ্বেতা রাগ করলো না। পাশ থেকে মহিউদ্দিন বললো, রান্না করা শিখছেন তো?
শ্বেতা বললো, হ্যাঁ, শিখছি।
মহিউদ্দিন বললো, তাহলে এবার সুবেশসুন্দর শতাব্দীর সেরা কার্তিকীয় যুবক খুঁজতেই হয়।
শ্বেতা হাসে আর বলে, প্রশস্ত হৃদয়ের হলেই হবে।
তারপর তারা কাজে মনোনিবেশ করে। বেশক্ষণ পরে শ্বেতা বললো, আপনি আর নির্মল স্যার একসাথে থাকেন না?
মহিউদ্দিন হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালো। শ্বেতা বললো, মধ্যরাত পর্যন্ত আপনারা বাইরে আড্ডা দেন কেন?
মহিউদ্দিন বললো, আমাদের দুইজনের শাসন করার কেউ নেই তাই!
বলেই মহিউদ্দিন হেসে দিলো। শ্বেতা হাসতে হাসতে বললো, শাসন লাগবে? ঠিক আছে!
হঠাৎ মহিউদ্দিন বললো, সেদিন হুমায়ুন স্যার, নাদিয়া ম্যাম মিলে নারায়ণ স্যারের সাথে আপনার বিষয়ে কথা বলছিলেন। নারায়ণ স্যারকে আপনার কেমন লাগে?
শ্বেতা তীর্যক চোখে চেয়ে বললো, ভালো। খুব ভালো।

বাসায় ফিরে মহিউদ্দিন সব বলে দিলো নির্মলকে। নির্মলকে গরমের স্বরেই মহিউদ্দিন বলছিলো, আপনি মনে-প্রাণে চাননি। আপনার চাওয়ার মধ্যে খাঁদ ছিলো। আপনি দ্বিধান্বিত ছিলেন। বনের সবচেয়ে সুন্দর হরিণীটি পড়ে থাকে না, আগেই বাঘের খপ্পরে পড়ে। গাছের ডালে কূজনরত সুন্দর পাখিটিই আগে শিকারীর শিকারে পরিণত হয়। ক্ষেতের সুন্দর ফল বা সবজিই আগে কৃষক দখলস্থ করে। আগেই বলেছিলাম খরস্রোতা নদীর মতো বেগবান হন। হলো তো? আফসোস আর আস্ফালন নিয়ে থাকেন।
নির্মলের উত্তরের অপেক্ষা না করে মহিউদ্দিন চলে গেলো। নির্মল বিমর্ষ হয়ে বসে পড়লো। খুব বিবর্ণ দেখাচ্ছে তাকে।

পরদিন অফিসে নির্মল শ্বেতার সাথে কোনো কথাও বললো না। অফিস শেষে শ্বেতা নির্মলকে সাথে করে বের হলো। শ্বেতা কৌতূহলের স্বরে বললো, ইদানিং আমার ব্যাপারে আপনি অনেক উদাসীন। আগ্রহটা যেন মরেই গিয়েছে।
নির্মল বললো, সুযোগ থাকলে আগ্রহ বাড়ে। সুযোগ দিলে আগ্রহ বাড়ে। ক্ষুদ্রতায় থেকে তো বৃহৎ স্বপ্ন দেখাও ঠিক না। আবদ্ধ জীবন, মৌন জীবন। আবদ্ধ পুকুরে কখনো ঢেউ উঠে না। আবদ্ধ পুকুরে কেউ কখনো সুখের সাঁতারও কাটে না। গোলাপ দেখলে মানুষ বনফুলের দিকে তাকায় না। বনফুলের তাতে কোনো কিছু আসে যায় না।
শ্বেতা বললো, প্রদীপ যতটুকু আলোয় অঞ্চল আলোকিত করে ততটুকুতেই মানুষ স্বপ্ন ফলায়।
নির্মল নির্বাক নয়নে সম্মুখে চেয়ে বললো, আমার অনুভূতি ধাক্কা খেতে খেতে ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। অমানিশা কিংবা পূর্ণিমা আমার কাছে দুই-ই সমান।
শ্বেতা বললো, জীবনে চাওয়া-পাওয়ার সময় কখনো ফুরায় না। মরা নদীও জেগে উঠে। কূল প্লাবিত করে। শুধু অপেক্ষা দরকার।
নির্মল নির্লিপ্ত নয়নে বললো, আমার আত্ম-বিশ্বাসের সলতে শুকিয়ে গিয়েছে।
শ্বেতা বললো, স্বপ্নকে তো কখনো স্বপ্নের মতো করে চাননি। আর তাই নীরব চোখের স্পষ্ট ভাষাও বুঝতে পারেন না। ভালবাসলে অপেক্ষার আগুনে পুড়তে হয়। ভাব সাগরের জলে ভাসতে হয়। আগুনে পুড়লে মানুষ ছাই হয়। ভালোবাসার আগুনে পুড়লে মানুষ খাঁটি হয়। কলস রমণীর কাখে আগুনে পুড়ে তবেই উঠে।
নির্মল কাঁধ বাঁকিয়ে বললো, আপনার কি মনে হয় না আপনার জীবনটা অপূর্ণ? প্রেম ছাড়া পূর্ণ হয় জীবন?
শ্বেতা কথা ঘুরিয়ে ফেললো। বললো, বাসে উঠতে আমার খুব কষ্ট হয়। তাছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হই। আপনি কি আমাকে আজ বাসে তুলে দেবেন!
নির্মল তত আগ্রহ দেখালো না। শ্বেতা নির্মলের নারাজী দেখে বললো, সব পরীক্ষায় ফেল মারলে শূন্য বুক কখনো পূর্ণ হবে? বিয়ের পর নারী কিন্তু চেনা পথও একা চলতে পারে না। স্বামী পেলে নারী স্বামীর উপর নির্ভরতাতেই সুখি হয় বেশি।
নির্মল শ্বেতার সাথে হাঁটতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলো। শ্বেতা ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুঁটিয়ে কাঁধ ব্যাগ থেকে নির্মলের দেওয়া উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ বের করে দিয়ে বললো, অবশ্যই শেষ পৃষ্ঠাটা পড়বেন।

শ্বেতা দ্রুত হেঁটে চলে গেলো। নির্মল বইটি হাত ব্যাগে রেখে দিলো। বাসায় ফিরলো। একবার শেষ পৃষ্ঠা পড়তে চেয়েও পড়লো না। না পড়ে বইটি বুক সেলফে রেখে দিলো।

পরদিন নতুন একটা শাড়ি পরে শ্বেতা অফিসে এসেছে। গতানুগতিকের বাইরে যেয়ে একটু অন্য রকম করে সেজেছে। এসেই নির্মলের দিকে লজ্জা লজ্জা চোখে তাকালো। দেখেও না দেখার ভান করলো নির্মল। কখনো মিষ্টি হেসে, কখনো প্রফুল্লচিত্তে শ্বেতা নির্মলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলো। অন্যান্য দিনের মতো নির্মলের তেমন সাড়া পেলো না। শ্বেতার মনে নানা চিন্তার বাতাস ঘূর্ণন খেলো। একটু পরে হুমায়ুন কবীর এলো। শ্বেতাকে দেখে বললো, ভালো দিনেই আরো পরিপাটি হয়ে এসেছেন। নারায়ণ স্যার তো মরেছেনই, এবার ভস্মও হবেন।
হুমায়ুন কবীর যেতে না যেতেই নাদিয়া এলো। বললো, এত দিনে নারায়ণ স্যার বিয়ের নাম মুখে এনেছেন। আপনার কপাল একটা! চাইলেনও না, সাম্রাজ্য পেয়ে যাচ্ছেন।
নজরুল এসে বললো, আমরা অফিসের সবাই চাই নারায়ণ স্যারের সাথে আপনার বিবাহটা হোক। অমত করবেন না। খুব সুখি হবেন জীবনে। নিতাই স্যার আজ আপনাকে সব জানাবেন।
শ্বেতার মুখটা মলিন হয়ে গেলো। ও তৎক্ষণাৎ পদত্যাগ পত্র লিখে নিজ ডেস্কেই রেখে অফিস থেকে বের হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিসের সবাই জেনে গেলো শ্বেতা চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছে। শুনে নির্মল বিভ্রান্ত হলো। শ্বেতা এমনটা কেন করলো! অফিস শেষে বাসায় এলো। মনটা ছটফট করছে ওর, কেন শেষ পৃষ্ঠাটা পড়তে বলেছিলো জানার জন্য মন চাঞ্চল্য হলো। ‘শেষের কবিতা’ বুক সেলফ থেকে বের করে শেষের পৃষ্ঠায় চোখ ফেললো। লেখা, “নির্মল, অমিত ও লাবণ্য পরস্পর পরস্পরকে আপ্রাণ ভালোবেসেছে, কিন্তু নানা কারণে অমিত কেতকীকে, লাবণ্য শোভনলালকে বিয়ে করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্মল, আমি অমিত বা লাবণ্যর মতো নই; আমাকে যে ভালোবাসে, আমি যাকে ভালোবাসি, নানান বাধা পেরিয়ে হলেও আমি তাকেই বিয়ে করবো। ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি, তোমাকে”।

কথাগুলো পড়ে নির্মল বইটি বুকে চেপে ধরলো। শ্বেতার ভালোবাসা আর ভালোবাসার দৃঢ়তায় সে বাক্যহারা হয়ে গেলো।

====================