You are currently viewing মীনের অসুখ || সাদাত সায়েম

মীনের অসুখ || সাদাত সায়েম

মীনের অসুখ

সাদাত সায়েম

ফজরের নামাজের পর আশ্বিনের একটা স্নিগ্ধ ভোর ফুটে উঠলো। আর আমরা যারা স্থানীয় মসজিদের হাফেজ হুজুরের কাছে পড়তে যেতাম তারা তৎপর হয়ে উঠলাম। হাফেজ হুজুর ফজরের নামাজ শেষে মুসুল্লিরা চলে গেলে মসজিদের বারান্দায় এলাকার ছোট ছেলে-মেয়েদের কায়দা, সিপারা ও কোরআন শরিফ পড়াতেন। বিনিময়ে তিনি আজ এর বাসায় তো কাল ওর বাসায় খেতে পেতেন। হুজুর শুধু কোরআনে হাফেজ ছিলেন, ক্বারী ছিলেন না, তার উপর বয়স ছিল কম; তাই এলাকার মুরুব্বিদের উপর উনার তেমন প্রভাব ছিল না। এলাকার মুরুব্বিরা যখন রমজান মাসে খতমে তারাবিহ পড়ানোর জন্য একমাসের চুক্তিতে একজন ক্বারী হুজুরকে নিয়ে আসতো, তখন ক্বারী হুজুর তারাবি নামাজের পাশাপাশি ওয়াক্তের নামাজেও ইমামতি করতেন। সেই পরিস্থিতিতে হাফেজ হুজুরের কাজ হতো নামাজ পড়াতে শুরু করার ঠিক আগে ক্বারী হুজুরের পেছনে দাঁড়িয়ে ইকামত দেয়া। তখন হাফেজ হুজুরের মুখটা খানিকটা মলিন দেখাতো। রমজান মাস শেষে ক্বারী হুজুর চলে গেলে হাফেজ হুজুর আবার নামাজের ইমামতি করতে শুরু করতেন। তবে কোন অবস্থাই হাফেজ হুজুরের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির রংকে ম্লাণ করতে পারতো না। তিনি থাকতেন সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, ফিটফাট। মসজিদের ভেতরে এইসব উত্থান-পতন আমাদের অর্থাৎ ভোরবেলার মক্তবের ছাত্র-ছাত্রীদের স্পর্শ করতো না। আমরা বরং অন্যান্য বিষয়-আশয় নিয়ে ভাবিত ছিলাম। আমাদের মধ্যে দুই জন মাত্র কায়দা, সিপারা শেষ করে কোরআন শরিফ পড়তে শুরু করেছিল। তারা যখন ডানহাতের তর্জনী ও বুড়ো আঙ্গুলের মধ্যে মোটা কাগজ দিয়ে তৈরি তিনকোণাকৃতির বুকমার্ক ধরে ডানদিক থেকে বামদিকে কোরআন শরিফ পড়ে যেতো; তখন আমরা যারা সবে কায়দা ও সিপারায় ছিলাম তারা ভাবতাম: কবে আমরাও! মরিয়ম ছিল সেই আগ্রগামী দুইজনের একজন। আমরা যারা তখনও ‘আলিফ’ খালি, ‘বা’-এর নিচে এক নোক্তা, ‘তা’-এর উপর দুই নোক্তা পড়তাম, তাদেরকে সে একটু নীচু চোখেই দেখতো। আমরা অবশ্য মরিয়মকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম, যেহেতু আমরা জানতাম মরিয়ম আর খুব বেশি দিন মসজিদে হুজুরের কাছে পড়তে আসতে পারবে না। হাফেজ হুজুর ভোরবেলার মক্তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে যে বয়সসীমা মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন, মরিয়ম তার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

যাহোক, সেদিন ভোরে আমরা মসজিদে গেলে মরিয়ম আমাদের অবাক করে দিলো। তার নাক উঁচু ভাব যেন কিছুক্ষণের জন্য হলেও সরিয়ে রেখে আমাদের সামনে সে একটু লজ্জিতমুখে দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। আমরা আমাদের ঘুম-লেগে-থাকা চোখ দিয়ে দেখলাম তার দুহাতে স্থাপিত একটা রেহেল! আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম রেহেলটার দিকে কারণ কোন রেহেল যে এতো সুন্দর হতে পারে তা আমাদের ধারনার মধ্যে ছিল না। আমাদের মনে হয়েছিল আশ্বিনের সেই স্নিগ্ধ ভোরে রেহেলটা থেকে একটা অলৌকিক মায়াবী আলো বের হচ্ছে— যেমনটা আমরা আমাদের বাসায় কোন কোন তসবি থেকে রাতের বেলা বের হতে দেখতাম! সেদিন হাফেজ হুজুরের কাছ থেকে ফেরার পথে আমরা মরিয়মের রেহেলটা নিয়েই কথা বললাম। আমাদের বেশিরভাগরই রেহেল ছিল না, যে দু’একজনের রেহেল ছিল তাদেরগুলো ছিল পুরাতন ও বৈচিত্র্যহীন। আমাদের সাথে মক্তবে যেতো পুতুল। সে আমাদের বয়সী হলেও জানতো আমাদের চেয়ে বেশি, বকতো তারচেয়েও বেশি। সে বললো: রেহেল সুন্দর হবে না! আমু ভাই নিজে বানিয়ে দিয়েছে! তারপর, যা তার স্বভাবের সাথে একেবারেরই যেতো না, গলাটা একটু নিচু করে বললো: আমু ভাই মরিয়মকে পছন্দ করে! সেদিন পুতুলের এই গলার স্বর নিচু করা আমাদের সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল! তবে আমরা ছেলেরা ভাবতে লাগলাম আমাদেরও যদি কখনো কোন মেয়েকে ভালো লেগে যায়, তাহলে আমরা কি তাকে এমন চমৎকার একটা রেহেল দিতে পারবো যার বাইরের অংশে লতা-পাতার নকশার আড়াল থেকে সন্তর্পণে উঁকি দিবে দুটি গোলাপ কুঁড়ি! এই ভাবনাই আমাদেরকে আমু ভাইয়ের দোকানে যেতে উৎসাহ যোগাল। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম কবে আমু ভাই আরেকটা নতুন রেহেল বানাতে শুরু করবে আর আমরা শিখে নিতে পারবো রেহেল বানানোর কলাকৌশল যাতে আমু ভাই যেমন মরিয়মকে উপহার দিয়েছে, ঠিক তেমনি আমরা যদি কাউকে, এমনকি মুখরা পুতুলকেও, পছন্দ করে ফেলি তাহলে যাতে তাকে একটা সুন্দর রেহেল উপহার দিতে পারি। কিন্ত আমু ভাইকে আমরা আর কখনও রেহেল বানাতে দেখলাম না। বরং তার দোকানে গেলে সে আমাদের হাতে তুলে দিতে লাগলো কাঠের তৈরি মাছ।

ফার্নিচার তৈরির দোকানটার মালিক অবশ্য ছিল আমু ভাইয়ের চাচা। তার চাচা বাপ-মা মরা ভাতিজাকে দোকানটা দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে নিজে উপজেলা সদরে বড় একটা চালের আড়ত চালাতো। ফার্নিচার তৈরির দোকানটাতে মাঝে মাঝে এসে কর্মচারীরা যারা খাট, টেবিল ও চেয়ার বানাতো তাদের কাজকর্মের খোঁজখবর নিতো। আমু ভাইয়ের চাচা আমাদেরকে দেখলে বিরক্ত হতো। আমু ভাই যে আমাদেরকে বেঁচে যাওয়া কাঠ থেকে মাছ বানিয়ে দিতো তা সে পছন্দ করতো না। কিন্তু আমু ভাই লুকিয়ে লুকিয়ে কাঠের মাছ বানিয়ে যেতে লাগলো। তবে একটা অলৌকিক সুন্দর রেহেল বানানোর কলাকৌশল আমাদের কাছে অজ্ঞাতই থেকে গিয়েছিল কারণ আমরা আর কখনো আমু ভাইকে রেহেল বানাতে দেখলাম না।

যারা ভোরে হাফেজ হুজুরের কাছে পড়তে যেতাম, তাদের মধ্যে আমরা কয়েকজন মাত্র স্কুলের ছাত্র ছিলাম। হুজুরের কাছে পড়া শেষ করে আমরা বাসায় ফিরে তৈরি হয়ে স্কুলে যেতাম। পুতুলসহ অন্যরা স্কুলে যেতো না। তারা ছিল দিনমজুর কী কৃষক কী রিকশাচালকের ছেলে বা মেয়ে। পুতুল আসতো জেলে পাড়া থেকে। স্কুলের মতোই হাফেজ হুজুরের অস্থায়ী মক্তবেও বিভিন্ন কারণে ছেলে-মেয়ে ঝরে পড়তো।

যেমন মরিয়মও ঝরে পড়লো— বয়সের কারণে। যদিও সে আমাদেরকে নীচু চোখে দেখতো, তবু আমরা দুঃখ পেলাম। আমরা জানলাম সেই রেহেলটা আমরা আর দেখতে পাবো না যাতে কোরআন শরিফ রেখে মাথায় ওড়না দিয়ে মরিয়ম মৃদুস্বরে ডানদিক থেকে বামদিকে পড়ে যেতো। রেহেলটা আমাদেরকে তার কথা ভুলতে দিলো না তবে আমরা আমু ভাইয়ের দোকানে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। আমরা হয়তো আমু ভাইয়ের কথা ভুলে যেতে পারতাম কিন্ত হঠাৎ সারাদেশ জুড়ে মাছের মড়ক দেখা দিলে আমু ভাইয়ের কাঠের মাছগুলো আমাদের সামনে নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হলো।

মাছের মড়কের সেই দিনগুলোতে আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে যে খাল ছিল তার পানিতে পুঁটি সরপুঁটি, সোল কি টাকি মাছ ভেসে উঠতে থাকলো। শরীর থেকে অনেকটা মাংস খসে পড়া, কঙ্কাল অর্ধেক বের হওয়া মাছেরা মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে পানিতে কাতরাতো। তাদের ব্যথাতুর চোখ আমরা ভুলতে পারতাম না। আমরা ভেবে পেতাম না পৃথিবীর এমন কী হয়েছে যাতে মাছেরা জলের উপরে ভেসে উঠছে আর এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে মরছে। আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা বললো এ হচ্ছে কৃষিতে যথেচ্ছ রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ফল।

সেই মড়কে আমাদের বাসায় বাসায় মাছ খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে জেলেদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেলো। একদিন শুনলাম পুলিশ এসে পুতুলের চাচাতো ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে চুরির অপরাধে। পুতুল একেবারে চুপচাপ হয়ে গেলো। কিছুদিন পর শুনি পুতুলের বিয়ে। যদিও পুতুলের বিয়ের বয়স হতে ঢের দেরি ছিল। ফলে মুখরা পুতুল বয়স্ক স্বামীর হাত ধরে চুপচাপ চলে গেলো এমন এক এলাকায় যার নাম আমরা তার বিয়ের সময়ই প্রথম শুনতে পেয়েছিলাম। পুতুল বৃষ্টির দিনে আমাদের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলতো: ফিঙ্গে মেঘ দেখে আনন্দে লেজ নাচায়। সে অবশ্য ফিঙ্গেকে বলতো ‘ফেউচ্চা’ আর লেজ কে বলতো ‘লেঞ্জা’। এইসব কথা আমাদের কাছে রেখে মাছের মড়কের মধ্যে খালের উপর পুল পেরিয়ে পুতুল চলে গিয়েছিল।

এদিকে আমু ভাই বাঁশের শুকনো গুড়ি থেকে একটা মুখ ফুটিয়ে তুললো। মুখটা যেই দেখলো সেই বুঝতে পারল ওটা কার মুখ। ফলে মরিয়মের বাপ এলাকায় সালিশ বসালো। সেই মাছের মড়কের মধ্যে, খালের পানি থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধের ভেতরে গ্রামের মুরুব্বিরা চৌরাস্তার মোড়ে হ্যাজাক বাতির আলোতে যে সালিশ বসিয়েছিল তাতে আমু ভাইকে একঘরে করা হয়েছিল। তখন আমরা মুরুব্বিদের মাঝে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা হাফেজ হুজুরকে দেখতে পেয়েছিলাম। এই পরিস্থিতিতে আমরা আমু ভাইয়ের কাঠের মাছগুলোর কাছে ফিরে গিয়েছিলাম।

আমাদের সাথে মক্তবে ও স্কুলে পড়তো বেলাল। সে আমু ভাইয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলো সে কেন কাঠ দিয়ে মাছ বানায়। আমু ভাই প্রথমে বলেছিলো: এমনি এমনি্! ভালো লাগে তাই! পরে অবশ্য সে আমাদের ইউনুস নবীর কথা শুনিয়েছিল। মাছের পেটে আটকে গিয়েও কিভাবে নবী সেখান থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন তা বলেছিল। এরপর থেকে আমরা — যারা খালের উপর কংক্রিটের পুল ছিল তা পাড় হয়ে স্কুলে যেতাম — ভাবতে শুরু করেছিলাম যে একদিন ঐ খালেও সেইরকম বিশালাকৃতির মাছ ভেসে উঠবে আর আমরা সেই মাছের সৌন্দর্য্য আর সাহস দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবো। কিন্তু বিশাল কোন সুন্দর মাছ ভেসে উঠার বদলে; মাছের মড়কের দিনগুলোতে আমাদের পরিচিত মাছগুলোই ভেসে উঠছিল আমাদের চোখের সামনে, একেবারে মুমূর্ষু অবস্থায়।

আমাদের এলাকায় এইসব ঘটনার বহুদিন পর বেলাল ঢাকা থেকে বাড়িতে আসলে তার সাথে মরিয়মের আবার দেখা হয়ে যায়। মাঝেসাজে বাড়িতে আসলে বেলাল মায়ের কাছ থেকে মরিয়মের খবরাখবর পেতো। তবে কখনো দেখা হয়নি। সেদিন বাস থেকে নেমে বাসস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়ালে সে দেখতে পেলো বোরকাপরা এক নারী তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার ডানহাতে একটা ব্যাগ ধরা, অন্যহাতে ধরে রেখেছে একটা ছোট্ট মেয়ের হাত। তাদের পেছন পেছন হেঁটে আসছে নয়-দশ বছরের একটা ছেলে। বেলালের সামনে এসে নারীটি ব্যাগ নামিয়ে রেখে মুখের কাপড় সরিয়ে বললো: বেলাল, আমি মরিয়ম। চিনতে পারছো? আমি বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। আজ ফিরে যাচ্ছি। এখান থেকে শশুড়বাড়ীর বাস ধরবো। এরা আমার ছেলে-মেয়ে।‘ এই বলে মরিয়ম বেলালের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।

বেলাল দেখলো ছোটবেলায় মরিয়ম তাদের অর্থাৎ মক্তবের ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলার সময় স্বরে যে অবজ্ঞা নিয়ে কথা বলতো, এখন আর তা নেই। বরং তার চোখে আর কথায় আশ্চর্য্য এক কোমলতা। আর তার চেহারায় সৌন্দর্য্য যেনো আরো বেড়ে গেছে।

বেলাল বললো: হ্যাঁ, চিনেছি। তবে তুমি আমাকে ‘তুই’ করে বলতে!

মরিয়ম একটু হাসল। তার ছেলে-মেয়ের দিকে তাকালো একবার তারপর বললো: সে কতো আগের কথা! তখন কাকে কি বলে ডাকতাম এখন কি আর তা মনে আছে!

মরিয়মের এই কথায় বেলালের আমু ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। আমু ভাই আত্মহত্যা করেছিল কাঠ বার্নিশ করার স্পিরিট খেয়ে।

বেলাল নিরুপায় ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে বসলো: রেহেলটার কথা মনে আছে?

এই প্রশ্নে মরিয়ম বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়লো। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো: আমাদেরকে এখন বাসে উঠতে হবে। আচ্ছা, যাই! ভালো থেকো।

খানিক এগিয়েই মরিয়ম পেছন ফিরলো।

‘রেহেলটা আমার কাছেই আছে!’

মরিয়মের এই ঘোষনায় কিনা কে জানে, বেলাল দেখলো বাসস্ট্যান্ডের পাশে প্রাচীন পুকুরে লাফিয়ে উঠলো দুটি নিরোগ মাছ!

********************