You are currently viewing ফুয়াদ হাসানের দশটি কবিতা

ফুয়াদ হাসানের দশটি কবিতা

ফুয়াদ হাসানের দশটি কবিতা

সুলতানের বজরা 

কোন ছবি আঁকছে না বসে ওরা এ শিশুস্বর্গে
মাকড়সা, ছুঁচো, সাপ বা পেশিবহুল মুরগীটা
চিত্রা সাঁতরে কবে ঐ ইট-শুরকির মড়কে
উঠে গিয়ে টিকটিকি, আরশোলা, মশা, উঁইভিটা
হয়ে গেছে; আগতরা ভাঙা গলুই – নুহের তরী
মনে করে, কথা বলে জোড়া পায়রা – চরদখল,
হত্যাযজ্ঞ নিয়ে, ধান মাড়াই-কাইজা ছড়ি
বজরার বৈঠাকে দেখে মারে হাসির গরল
এই তো নীহার বালা টিনের থালায় এঁটো ভাত
নিয়ে ঘুরছে, বিড়ালগুলো সুলতানী আমলের
পর দেখেছে এমন কেউ ছিল না মাসিমদিয়া!
আসমানে প্রথম বৃক্ষরোপণ রঙের চাঁদ
আদম সুরত ধরে লালমিয়ার কোলেতে ফের
বিড়ালের দেখা পাবে যখন বাতাসে বাঁশুরিয়া


তারা ভরা রাত

ভিনসেন্ট, তোমার ছবিটা এতো নীল কেন
বেদনার রঙ নীল ছিল বলে
এগারোটি তারা মৃত পাতাদের চেয়ে হলুদ
বুঝবে না কেউ দেখলে তা
কেবল দেখার ছলে
ঘুরপাক খেলে মেঘ এসে যেন হঠাৎ নেমেছে
টাওয়ার ফেলে দূরের ঝাপসা পাহাড়ের থামে
জ্বলজ্বলে চাঁদ এঁকেছ বন্দি বসে অ্যাসাইলামে
তেলরঙ নাকি কাটা বাম কানের গোড়ায়
জমে ছিল রক্ত থকথকে কাঁচা
আত্ম হননের আগে মাত্র কটাদিন
শীতঘুম শেষে জেগে ওঠা
ড্যাফোডিলে কষ্টেসৃষ্টে বাঁচা
দৃশ্যটার সামনে দাঁড়ালে মনে পড়ে জানলার
শিক ধরে দেখা বড্ড ক্লান্তিকর দিন-রাত স্মৃতি
চোখের সামনে ভেসে ওঠে ক্ষত আত্মপ্রতিকৃতি


গুয়ের্নিকা, একটি শহরের নাম

রক্ত বুঝি সাদা-কালো
নাকি খানিক ধূসর
কিউবিক আধছায়া আলো
পড়ে থাকে পোড়া ক্যানভাসে
ফালা আঙুল খণ্ডিত লেজ
সারি সারি কাটা হাত পা মাথা
মানুষের নয় শুধু ঘোড়া, বৃষ…
মায়ের বিলাপ মৃত সন্তান কোলে
হত যোদ্ধা না আহত তরবারি – কে পরাহত
বীভৎস দাঁত দেখিয়ে হা-করে আছে
খুলে নেয়া খুলি খাচ্ছে লুটোপুটি
বিদ্ধ হাতল ধরেছে খুব শক্ত মুঠোয়
হাতে বর্শা বিচ্ছিন্ন ফুল
সূর্যের মত টর্চার সেলের
বাল্বের এমন রক্তচক্ষু আলো
কে কতটা ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর নাকি ছবি –
গুয়ের্নিকা
গৃহযুদ্ধ থামবেই শেষ বিশ্বযুদ্ধের আগে
থামবে বাকি সকল বিভীষিকা


দাউদ ও ডেভিড

মার্বেলের কয়েদখানা থেকে বের হয়ে এসেছ দৈবাৎ
এসেই দাঁড়িয়ে গেছ ফ্লোরেন্স চত্বরে
হাতুড়ি-শাবল দিয়ে একটু একটু করে
পাথরের পেট চিঁড়ে
বের করে এনেছে হালকা আলগানো পায়ের গোড়ালি
ঊরু শিশ্ন পেট নাভি বুক বাহু গ্রীবা নাক মুখ চুল কুঁচকানো ভ্রু বা শিরা-উপশিরাসহ
সতের ফুটের নগ্ন সুঠাম দেহটা
শুনলে তোমার গান নাকি
বৃক্ষ-পশুপাখি নয় শুধু
লৌহখণ্ড পারদের মত গলে যেত
অথচ এখন পাথরের গর্ত থেকে মুক্তি পেয়ে
নিজেই পাথর বনে গেছ


দালির ঘড়িরা

মাখনের মতো গলে পড়ছিল পকেটঘড়ির দেহ
গলে পড়ছিল আইসক্রিমের মতো একেক মুহূর্ত
ডায়াল আছড়ে বের হয়ে আসছে প্রতিটি কাঁটা
হাড্ডি মাংস-মগজ, রক্ত নাড়িভুঁড়ি কলকব্জাসহ
প্রতি অণু পল, বেকার সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টার দাগ
নয় – দিন পক্ষ মাস বছর, নগণ্য শত সূর্যবর্ষ
অস্ত বিধ্বস্ত দিগন্তে পথহারা নাবিক-সময় খুঁজে
পেরেশান, শুনশান বালুকা বেলায় হিসু করা যেন
তবুও সময় গলে পড়ছিল একটু একটু করে
অনতি দূরত্বে সমুদ্রের ঢেউগুলো একেবারে স্থির
পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে ক্লান্ত, চলতি অনন্ত ক্ষণ
পিঁপড়ের আঘাতে রক্তাক্ত, বিষমাছির কামড়ে নীল
মৃত গাছের ডালে ঝুলে আছে নাছোড়বান্দা যে ঘড়ি
তার কর্কশ এলার্মে সুর পেয়েছিল স্যুরিয়ালিজম


যমজ ফ্রিদা

তোমাকে না তোমার জীবন বেশি ভালো
বেসেছি, মুশকিল বলা, নাকি তোমার
আঁকা চিত্রকলা
ইজেল নয় হিম শল্যখানাটার
নির্দয় টেবিলে বত্রিশদফায়
নিজেকে কাটাছেঁড়া করে, ভেঙে,খুঁচিয়ে
বানিয়েছ অর্ধশত কী জীবন্ত
আত্মপ্রতিমাকে
তাই জলরঙের বদলে খুঁজে পাবে
সফেদ গাউনের বুকে রক্তফুল
ক্রাচ, বেড, হুইলচেয়ার, ছুরিকাঁচি
সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ মোড়ানো কাঁটাদেহ
গলার জিঞ্জিরে বন্দি মনপাখি
নিজেই হয়ে গেছে কেমন চাঁদমারি
অথচ চেহারা বা খোঁপাবন্দি চুলে
পড়েনি এর রেশ
সত্যি, ঊরুহীন তোমার ছিল পাখা
এবং ছিলে চিরকাল এক আহত
চিত্রল হরিণ
ফ্রিদাতে ফিদা হয়ে আছি, যমজ ফ্রিদা
দুঃখে থাকে না, নেই কোন দ্বান্দ্বিকতা


অ্যামেরিকা

অ্যামেরিকা কোন এক শৌচাগারের নাম, আরও নির্দিষ্ট করে বললে – একটা কমোডের, সোনা দিয়ে তৈরি, আঠারো ক্যারেটের।
যে কেউ চাইলে একে ব্যবহার করতে পারে, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু, কালো-সাদা, আহত-নিহত নির্বিশেষে… স্রেফ কিছু খরচ লাগবে! যদিও
আফগানিস্তানের পঙ্গু যোদ্ধা, ইরাকের সর্বহারা নারী, প্যালেস্টাইনের এতিম শিশু আর সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের জন্য একেবারে উন্মুক্ত।
ফ্লাশ দিলেই হয়তো রক্তরঙা জল বেরিয়ে আসবে, অস্ত্রশস্ত্রের ভগ্নাংশের মতো ছোটবড় খণ্ডবিখণ্ড হাত-পা-মাথা, বারুদের গন্ধমাখা ক্ষতবিক্ষত তারকা খচিত পতাকা!
ইচ্ছে হলে দেখে আসতে পার; আমেরিকায় বসে, অ্যামেরিকার সাথে এমন কিছু করার সুযোগ কিন্তু আর কোনভাবেই পাবে না!


নৃত্য 

সহচর-সহচরী
একসাথে নাচ করি
ঘোর জীবনানন্দে
ছন্দহীন ছন্দে
সতেজ সবুজ ক্ষেত
নীলাকাশ ঝরে মেদ
দুটি হাতে রেখে হাত
স্বচ্ছ কমলা চাঁদ
চাঁদ কই নর-নারী
করে আছাড়ি-বিছাড়ি
এলোমেলো মুদ্রায়
মাতাল নগ্ন পা’য়
জীবনের যত বিষ
আছে রাঙিয়ে মাতিস
ঠিক খুঁজে পাবে তাকে
দলটার কোন ফাঁকে
রঙ ঢালতে সাহস
সীমাহীন লাগে রস
ঠিক নাচতে যেমন
বাহুতে রঙিন মন
জীবন মদিরা পান
আমোদে বন্য গান
এসো তবে নাচ করি
সহচর-সহচরী


আর্তনাদ
 
আর্তনাদটা ফ্রেম ছাপিয়ে
চারদেয়াল ভেঙে
মুঙ্ক মিউজিয়ামের গণ্ডি ডিঙিয়ে
অসলো শহর অতিক্রম করে
ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়
কেন এই আর্তনাদ
ভয় নাকি আতঙ্কে
অবাক হয়ে কী বিমোহিত ভঙ্গিতে
না গোপন কোন কষ্টে
এমন দু-গালে হাত রেখে
ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে
প্রায় পাগলের মতো
রক্তিম গোধূলিতে
ছবির সে চিৎকার
কানে নয়
ভীষণ চোখে এসে লাগছে


জুয়াড়ি

সরাইখানায় মুখোমুখি
বসে আছে দু’জন শ্রমিক
জুয়া খেলছে বা খেলছে না!
মাথায় মলিন কেপ, ঠোঁটে
পাইপ একজনের, দূরে
ছিপি মারা পানীয়-বোতল
দু’হাতে সাজানো কার্ড, চোখ
নিচে – নিবিড় তাকিয়ে থাকা
টেবিলে ছিল না কোন দান
মাঝখানে সেজান, তিনশ
মিলিয়ন ডলারের মতো
একা জিতে নিলেন জুয়ায়!

ফুয়াদ হাসান

জন্ম : ১৯৭৯ সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর।  পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
মানুষ মানুষ নয় হোমোসেপিয়ানস (২০০৪, বলাকা);
রাফখাতার কাটাকুটি (২০১০, তেপান্তর);
অ্যা জার্নি বাই অ্যাম্বুলেন্স (২০১৮, বাঙ্ময়);
কাঁটাতারে কারাগারে (২০২১, বেহুলাবাংলা)।

==========================