You are currently viewing পল সেলানের কবিতা। অনুবাদঃ ঋতো আহমেদ

পল সেলানের কবিতা। অনুবাদঃ ঋতো আহমেদ

পল সেলানের কবিতা

ভাষান্তরঃ ঋতো আহমেদ

 

কবি-তথ্য

পল আনসচেল (Paul Antschel) থেকে পল অনসেল (Paul Ancel), তারপর পল সেলান (Paul Celan)। যখন ১৯৪৭ সালে রোমানিয়ান পিরিয়ডিকাল-এ তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখনই করা হয় এই আনাগ্রাম। মানে, আনসচেল শব্দটির অক্ষরগুলিকে এদিক সেদিক করে শেষে পল সেলান নামটি পরিণতি পায়। তিনি ২৩ শেনভেম্বর ১৯২০ সালে বুকোভোনিয়ার জারনোভিটস-এ (বর্তমান নাম চেরনভ্টসি) জন্ম গ্রহণ করেন। সেখানে স্কুলের পর্ব শেষ করে প্রথমবারের মতো প্যারিস আসেন ১৯৩৮ সালে মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে একটি মেডিকেল টিমের সাথে ট্যুরে। তবে এর পরের বছর আবার বাড়ি ফিরে যান রোমান ভাষা আর সাহিত্যে পড়াশুনা করার জন্য। ১৯৪০ এর জুনে সোভিয়েত বাহিনীর অধীনস্ত হয় জারনোভিটস। তারপরও সেলান তাঁর পড়াশুনা চালিয়েযেতেপারেন ১৯৪১ পর্যন্ত। আর তখন জার্মান আর রোমানিয় বাহিনী এসে দখল নেয় ওই এলাকার। ইহুদিদেরকে একটি বস্তিতে জড়ো করা হয়। সেই সময়টায় তিনি রুশ শেখেন আর ইয়েসনিনের কিছু কবিতা অনুবাদ করেন। ১৯৪২-এর গ্রীষ্মের দিকে তাঁর মা-বাবাকে ট্রান্সনিসট্রিয়ার একটি ক্যাম্পে নির্বাসিত করা হয়। সেখানে তাঁর বাবা টাইফাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আর তাঁর মাকে পরবর্তীতে ‍গুলি করে মেরে ফেলা হয়। পাকড়াও হবার আগ পর্যন্ত সেলান অবশ্য পালিয়ে থাকতে পেরেছিলেন কিছুদিন। শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ মলদাভিয়ায় তাঁকে দিয়ে রাস্তা তৈরির কাজ করানো হয়। কিছুদিন দাদার কাছে আর কিছুদিন তাঁর একবন্ধুর বাবা-মার কাছেও থাকেন। ১৯৪৪-এর ফেব্রুয়ারিতে যখন লেবারক্যাম্প বিলুপ্ত হয় তখন সেলান আবার বুকোভোনিয়ায় ফিরে আসেন। বুকোভেনিয়াকে তখন সোভিয়েতের আওতায় ইউক্রেনের সাথে যুক্ত করা হয়।

বলা হয়ে থাকে তিনি একসময় সাইকিয়াটিক ইউনিটে ফিল্ডসার্জন হিসেবে কাজ করেছেন। আর তাঁর পড়াশুনা চালিয়ে যান ১৯৪৫-এর এপ্রিল পর্যন্ত। সে সময় তিনি বুখারেস্ট চলে যান আর প্রুফরিডার হিসেবে এবং রুশ থেকে লেখা রোমানিয়-তে অনুবাদের কাজ করেন প্রকাশকদের সাথে। এই সময়ই তাঁর নাম আনসচেল থেকে সেলান হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরে তিনি অবৈধভাবে রোমানিয়া থেকে ভিয়েনায় যেতে সফল হন, কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকেননি। পরের বছর জুলাইয়ে প্যারিসের উদ্দেশ্যে ভিয়েনা ত্যাগ করেন। এইসময় অস্ট্রিয়ায় তাঁর প্রথম কবিতাবই “ভস্মাধারের ছাই”(Der Sand aus den Urnen / The Sand from the Urns, 1948) প্রকাশিত হয়। যেটি তিনি বাতিল করেন অনেক ভুল ছাপার কারণে। প্যারিসে তিনি জার্মান সাহিত্যে অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯৫০ সালে লাইসেন্স অর্জন করেই কোলনর মালসুপেরিয়ার-এ জর্মনভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৫২ সালে গ্রাফিকআর্টিস্ট জিজেল লেস্ট্রেইঞ্জ-কে বিয়ে করে প্যারিসেই স্থিতু হন ১৯৭০-এর এপ্রিলের ২০ তারিখে স্যেন নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার আগ পর্যন্ত, যখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৯তাঁদের প্রথম সন্তান ফ্রান্সিস যদিও শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু দ্বিতীয় সন্তান এরিক বাবারপুত্র-বাৎসল্যের সাথে বড় হয়ে ওঠেন ধীরে ধীরে।

তাঁর প্রথম কবিতা বই“ভস্মাধারের ছাই”(Der Sand aus den Urnen)এর অধিকাংশ কবিতাই আমরা দেখতে পাই “পপি আ রস্মৃতি”(Mohn und Gedächtnis / Poppy and Memory, 1952) কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা। সেলানের পরবর্তী কবিতা বই প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে“ সীমানা থেকে সীমানায়”(Von SchwellezuSchwelle). এ’সময়, ১৯৬০ সালে তিনি জার্মান একাডেমি ফ ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড লিটারেচার, ডার্মস্ট্যাড থেকে সর্বোচ্চ সম্মানের পুরষ্কার Georg Buchner Prize-এ ভূষিতহন।

আর, তাঁর পরবর্তী দুটি বই“ভাষণগরাদ”(Sprachgitter /Speech Grille, 1959) এবং“কারও-নয়-যে-গোলাপ”(Die Niemandsrose / The No-One’s-Rose, 1963) প্রকাশের মাধ্যমে সেলান তাঁর কবিতা-জীবনের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেন। জর্মন ভাষার জগতে এ দুটি বই সবচেয়ে বেশি অবিসংবাদিত প্রশংসা লাভ করে। এছাড়াও তিনি কিছু অনুবাদের কাজ করেন। ফরাসি থেকে জর্মন ভাষায় র‌্যাঁবো, ভ্যেলেরি, এপোলিনের, মিশুক, রুনীশাঁ, আঁন্দ্রেদি বুঁসে, আরজঁদেইভ অনুবাদ করেন। ইংরেজি থেকে করেন সেক্সপিয়র, এমিলি ডিকিনসন আর মেরিয়ান মুর। রুশ থেকে করেন ব্লক, ইয়েসনিন আর ম্যান্ডেলস্টাম। বুখারেস্ট থাকার সময় তিনি কিছু রুশ গদ্যও রোমানিয়তে অনুবাদ করেন।

 

 

কবিতা

 

আস্পেনগাছ

আস্পেনগাছ, অন্ধকারে তোমার পাতাগুলো শুভ্রতায় ঝলকায়।

আমার মায়ের চুল তখনো পাকেনি।

 

ডান্ডেলিয়ন, দারুণ সবুজ ইউক্রেন।

আমার হলুদাভ চুলের মা বাসায় ফেরেননি।

 

মেঘবৃষ্টি, কুয়োর উপর তুমি কি ভেসে থাকো?

আমার নিরীহ মা ফুঁপিয়ে কাঁদেন সবার জন্য।

 

গোলাকৃতি নক্ষত্র, তুমি ওড়াও সোনালী ফাঁস।

আমার মায়ের হৃদয় চিরে ফেলা হয়েছে সীসায়।

 

ওক কাঠের দরজা, কে খুলে নিয়েছিল তোমার কব্জা?

নম্র মা আমার ফিরে আসতে পারেননি আর।

 

ফ্রান্সের স্মৃতি

 

এসো, স্মরণ করি একসাথে: প্যারিসের সেই আকাশ, সেই বিশাল শারদীয় ক্রোকাস…

 

হৃদয় কিনতে আমরা ফুলওয়ালীদের কাছে গেলাম:

ওরা ছিল নীল আর জলের উপর প্রস্ফুটিত।

আমাদের কামরায় তখন বৃষ্টি শুরু হলো,

আমাদেরই এক প্রতিবেশী এলেন ভেতরে, মঁশিয়ে ল্যু সঁজ, দুগলা পাতলা মানুষ।

সবাই মিলে আমরা তাস খেললাম, আমি হারলাম চোখের অশ্রু;

আর তুমি ধার দিলে তোমার চুল, হেরে যাই সেটাও, আমাদে রকুপোকাত করে দেয় সে।

তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে যায়, আর বৃষ্টি তাকে ধাওয়া করে।

শ্বাস নিতে নিতে এদিকে আমরা পড়ে থাকি মৃতের মতোন কেবল।

 

গণনা

 

কাজুবাদামগুলো গুনে দ্যাখো,

গুনো দেখো সেই সব তিক্তগুলোও যেগুলো সজাগ রেখেছে তোমাকে,

গুনে রেখো আমাকেও:

 

খুঁজি আমি সেই চোখ, যখন তা মেলে ধরো তবু দ্যাখে না তোমারে কেউ,

কেটে দিই গোপন সূতোটাও

যা বেয়ে গড়িয়ে নামবে শিশির, ভেবেছিলে

গড়িয়ে নামবে জগে

যেখানে লিখা আছে হৃদয় পথ খুঁজে পায়নি কারো।

 

কেবল সেখানেই সম্পূর্ণ-কি প্রবেশ করিয়েছো সেই নাম—তোমার,

নিজের‌ ভিতরে ফেলেছো-কি নিশ্চিত-পদক্ষেপ,

নৈঃশব্দ্য-ঘন্টায় তোমার অবাধে আঘাত করেছে হাতুড়ি,

পৌঁছাতে শুনেছো-কি তোমারই কাছে,

মরে গেছে যে, তার হাত‌ও জড়িয়ে ধরেছে তোমায়

আর তিনজন হেঁটে যাচ্ছো সন্ধ্যায় সেই অন্ধকারে।

 

আমাকে তিক্ত করো।

গণনা করো তোমাদের ওই কাজুবাদামের সাথে।

 

মরণসংযোগ

 

ভোরের কালোদুধ আমরা পান করি সন্ধ্যায়

পান করি দুপুরে আর সকালে আমরা পান করি রাতেও

আমরা পান করি আর করতেই থাকি

আমরা কবর খুঁড়ি হাওয়ায় যেখানে শুয়ে থাকা যায় অনবরুদ্ধ

আর ওই বাড়িটিতে যে লোকটি থাকে সাপ নিয়ে খ্যালে আর লেখে

সে লেখে যখন রাত্রি নামে জার্মানিতে তোমার সোনালী কেশ মার্গারিতা

এইসব লিখে রেখে বাইরে বেরোয় তারায়

ঝলমলে আকাশের নিচে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে ডাকে তার রক্ষীদের

বের করে আনে ইহুদিদের আর একটা কবর খোঁড়ায়

আমাদের আদেশ করে নাচার

 

ভোরের কালোদুধ আমরা তোমাকে পান করি রাত্রিবেলা

পান করি সকালে দুপুরে তোমাকে পান করি সন্ধ্যায়

আমরা তোমাকে পান করি আর করতেই থাকি

আর ওই বাড়িতে যে লোকটি থাকে সাপ নিয়ে খ্যালে আর লেখে

সে লেখে যখন রাত্রি নামে জার্মানিতে তোমার সোনালীকেশ মার্গারিতা

তোমার ধূসর কেশ সুলামিত আমরা কবর খুঁড়ি হাওয়ায় যেখানে শুয়ে থাকা যায় অনবরুদ্ধ

 

চেচিঁয়ে ওঠে সে পৃথিবীর আরও গভীরে তোমরা অনেক তোমরা অন্যরা গান গাও এবার এবং

নাচো

আর সে হাত রাখে তার বেল্টের লোহায় ঢেউ খেলায় তার চোখ দুটোই নীল

তোমাদের কোদাল দিয়ে আরও গভীরে তোমরা অনেক তোমরা অন্যরা নাচ চালিয়ে যাও

 

ভোরের কালোদুধ আমরা পান করি তোমাকে রাত্রিবেলা

পান করি সকালে দুপুরে আমরা তোমাকে পান করি সন্ধ্যায়

পান করি আর করতেই থাকি তোমায়

আর ওই বাড়িতে যে লোকটি থাকে তোমার সোনালী কেশ মার্গারিতা

তোমার ধূসর কেশসুলামিত সাপ নিয়ে খ্যালে সে

 

সময়ের চোখ

 

এটাই সময়ের চোখ:

সে দেখছে

সাত-রঙা ভ্রু’র নিচ থেকে আড়চোখে।

তার চোখের পাতা আগুনে ধুয়া পরিষ্কার,

তার চোখের জলতপ্ত বাষ্প।

 

তার দিকেই ছুটে আসে স্খলিত নক্ষত্র

আর চোখের উত্তপ্ত লোমের স্পর্শে গলে যায়:

সে-ই বাড়াচ্ছে উষ্ণতা পৃথিবীতে

আর মৃত

কলি আর ফুল।

 

ফ্রাঁসোয়ার সমাধিলিপি

 

পৃথিবীর দুটি দরজা

হা করে খোলা:

তুমিই খুলেছো

জোছনার আলোয় আর

আমরা কটকট আওয়াজ শুনতে পাইক পাটের

বয়ে নিয়ে যাই অনিশ্চয়তা

বয়ে নিয়ে যাই সবুজকে তোমার শাশ্বতয়।

 

চিঠি আর ঘড়ি বিষয়ক

 

মোম হচ্ছে

সেই অ-লিখিতকে সিল করার জন্য

যে তোমার নাম

অনুমান করেছিল,

যা তোমার নামকে

চিহ্নিত-ও করে।

হে ভাসমান আলো, তুমি কি আসবে এখন?

আঙুলগুলোও, মোমীকৃত,

ডুবে আছে

অদ্ভুত আর বেদনাময় আংটীর ভেতর।

ডগাগুলো গলে গেছে।

হে ভাসমান আলো, আসবে কি তুমি?

 

সময়ের ফাঁকা ঘড়ির মধুচক্র,

হাজারো মৌমাছির দাম্পত্য,

ছেড়ে যেতে প্রস্তুত।

হে ভাসমান আলো, এসো।

 

আমার সমস্ত ভাবনা সহ

 

আমার সমস্ত ভাবনা সহ আমি

পৃথিবীর বাইরে গিয়েছিলাম: আর সেখানে দেখা হলো তোমার সাথে,

তুমি আমার শান্ত, আমার উন্মুক্ত একজন, আর—

আমাদের সাদরে গ্রহণ করলে তুমি।

 

কে

বলেছে আমাদের চোখ ভেঙে গেলে

আমাদের জন্য সবই মরে যায়? আসলে

সমস্তই জাগ্রত, সমস্তই আবার শুরু।

 

দারুণ, একটা সূর্য বয়ে যাচ্ছিল, উজ্জ্বল

একটা আত্মা আর একটা আত্মামুখোমুখী, স্পষ্ট,

দক্ষতার সাথে তাদের নীরবতা সূর্যের জন্য একটা

কক্ষপথ তৈরি করলো।

 

সহজেই

উন্মুক্ত হলো তোমার কোল, প্রশান্তিময়

একটি প্রশ্বাস উঠলো ইথারবরাবর

আর তা থেকেই তৈরি হলো মেঘদল, তাইনয়কি,

এটি কি আমাদের থেকে উত্থিত এক আকৃতি ছিলনা,

এটি কি

নামের মতো ভাল ছিল না?

 

স্তব

 

কাদা আর মাটির মতো কেউ আর পিষে ফেলতেপারবে না আমাদের,

কেউ আর উড়োতে পারবেনা ধুলোয়।

কেউনা

 

তোমার নামের প্রশংসা, কেউ করে না।

তোমার জন্য

ফুল দেবো আমরা।

তোমার

চরণে।

 

আমরা কিছুই

ছিলাম না, কিছুই নই, কেবল

অর্পণ করে যাবো ফুল:

কিচ্ছু-না—, কারও-নয়

গোলাপ।

 

আমাদের

আধ্যাত্মিক গর্ভকেশর নিয়ে,

আমাদের স্বর্গ-বিধ্বস্ত পুংকেশর নিয়ে,

আমাদের করলা লাল

রক্তবর্ণ গান যা আমরা গেয়েছিলাম

আহা, বাধা

অগ্রাহ্য করে।

 

উজ্জ্বল পাথরগুলো

 

উজ্জ্বল

পাথরগুলো যায় বাতাসের ভেতর দিয়ে, উজ্জ্বল

সাদা, আলোক-

বাহক।

 

তারা

নিচে নামবেনা, পড়েও যাবেনা,

আঘাত‌ করবেনা। তারাখুলে

যাবে

ক্ষীণ আবরিত

বনগোলাপের মতো, উন্মুক্ত হবেওরা,

এভাবেই

তোমার দিকে, আমার নীরবতার দিকে,

আমার সত্যের পথে—:

 

তোমাকে দেখতে পাই, তুলে নিচ্ছ ওদের

আমার নতুন, আমার

প্রতিটি-মানুষের হাতে, রাখছো ওদের

আরো উজ্জ্বলতায় যার কোনো

বিলাপ কিংবা নামের প্রয়োজন নেই।

 

শব্দের স্তূপীকৃতকরণ

 

শব্দের স্তূপীকৃতকরণ, যেন আগ্নেয়গিরি,

ডুবে আছে সমুদ্র-গর্জনে।

 

উপরে,

বিপরীত-প্রাণিদের

উপচে-পড়া ভিড়:

তোলে পতাকা—ছবি আর অনুলিপি

সময়ের দিকে ব্যর্থ সমুদ্র-ভ্রমণ।

 

যতক্ষণ না তুমি চাঁদ-শব্দটি

ছুঁড়ে দিচ্ছ যা ঘটায়

অলৌকিক আগুন-জোয়ার

আর সৃষ্টি করে

হৃদয়-

আকৃতির গিরি-মুখ, শুধু শুরুর জন্য,

রাজকীয় জন্মের

জন্য।

 

যখন শুভ্রতা আমাদের আক্রমণ করলো

 

যখন শুভ্রতা আমাদের আক্রমণ করলো, রাতে;

যখন ভিক্ষার জগ পানির চেয়েও বেশি

প্রবাহিত হয়েছিল;

যখন গাঁথা হাঁটু আমাকে

সংকেত দিলো প্রস্তাবক বেল বাজিয়ে:

ওড়ো!—

 

তখন

আমি ছিলাম

সম্পূর্ণ স্থির।

 

 

নোটস

 

১) সেলান মনে করতেন কবিতা হবে অপ্রত্যাশিত, অনির্দেশ্য এবং অপূর্বনির্ধারণযোগ্য। অনেকটা বোতলে বার্তা ভরে সমুদ্রে ছুঁড়ে দেয়ার মতো। কেউ খুঁজে পাবেনা কোনোদিন অথবা পাবে হয়তো। তাই, পাঠককে খুঁজতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে কবিতার দিকে।

২) এ ধরনের কবিতা পাঠকের কাছে বিশেষ মনোযোগের দাবী রাখে। দাবী রাখে যে সত্যকে জারি করে সে, সেই সত্যের সত্যতায় বিশ্বাস রাখার। মনোযোগ আর বিশ্বাস ছাড়া যেন এই  পাঠক আর লেখকের মধ্যে এই রকম এক ঝুঁকি নিয়েই এগিয়েছে সেলানের কবিতা।

৩) সেলান জর্মন নিয়ে ভাষার যে ভাঙা-গড়া করেছেন, যে নতুন শব্দ বাক্য কথা সৃষ্টি করেছেন তা বাংলায় নিয়ে আসা কী করে সম্ভব? তিনি যে নতুন জর্মন লিখেছেন অনুবাদে সেরকম নতুন বাংলা কতোটা পারা যাবে? সেলান তো শুধু কথা বা মর্ম টুকুই নন। তাঁর কবিতা মানে তো ভাষাও—ভাষার পুনঃপ্রসব।

৪) “যে-ব্যক্তি নিজে অনুবাদ চর্চা করেছেন তিনিই বলতে পারেন অনুবাদ কতোটা উত্তীর্ণ, কতোটা নিখুঁত। মূল ভাষা থেকে সরিয়ে আনতে গিয়ে কতোটা হারিয়ে ফেলেছেন অনুবাদক। কী-কী তিনি যোগ করে ফেলেছেন। হয়তো অনিচ্ছাতেই যোগ করে ফেলেছেন, লেখার ঝোঁকে। এসব বিচার করতে পারবেন সেই লোক যিনি দুটো ভাষাই জানেন। যে-ভাষা থেকে অনুবাদ করা হচ্ছে সেটাও জানেন আবার যে-ভাষায় অনূদিত হচ্ছে সেটাও।”– জয় গোস্বামী

৫) সেলান অনুবাদক ও গবেষক পিয়ের জোরিস বলেন, ইংরেজিতে সেলানের কবিতার অনেক অনুবাদ পাওয়া যায় আজকাল, যেগুলো যথেষ্ট সাবলীল আর সহজ। সেগুলোকে তিনি ভালো অনুবাদ না বলে খারাপ অনুবাদ বলছেন। কারণ, সত্যিকার অর্থে সেলান কি সহজ? খোদ জার্মানিতে নেটিভ জার্মানরাই সেলান বুঝতে পারেন না। ওদের কাছেই তাঁর রচনা কঠিন। তাহলে ইংরেজি অনুবাদে সেলান তো আরও কঠিন হওয়ার কথা আর ইংরেজি থেকে বাংলায় তো আরও।

 

ঋতো আহমেদ।

কবি,গদ্যকার এবং অনুবাদক। মা রোকসানা পারভীন আর বাবা মোঃকামাল। জন্ম ১৯৮০ সালের ময়মনসিংহ শহরের কালীবাড়ি বাইলেন। গ্রাজুয়েশন করেছেন শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বদ্যিালয় থেকে শিল্পপ্রকৌশলে। আর কর্মজীবনে বর্তমানে একটি টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। বসবাস করছেন ঢাকায়।

 

তার প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে

ভাঙনেরমুখ, উন্নয়নের গণতন্ত্র, হে অনন্ত অগ্নি, জলের পাতাল।

প্রকাশিত অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ— ওয়াকিং টু মার্থাস ভিনিয়ার্ড,আদি রসাত্মক সংস্কৃত কবিতা।