You are currently viewing নাভীপদ্মে সঞ্চিত ধোঁয়া নিয়ে বিষ্ণুযাত্রা > নাহিদা আশরাফী

নাভীপদ্মে সঞ্চিত ধোঁয়া নিয়ে বিষ্ণুযাত্রা > নাহিদা আশরাফী

নাভীপদ্মে সঞ্চিত ধোঁয়া নিয়ে বিষ্ণুযাত্রা

নাহিদা আশরাফী

 

সূর্য ধীরে নিভে গেল। আকাশে গোলাপি একটা রঙ আস্তে অন্ধকারে হারাল। এক

বৃদ্ধকে ঘিরে আমরা বসে আছি কিছু তরুণ তরুণী। বহুকালের প্রাচীন।  আমাদের

কিছু বলবে ভেবেছেঅথবা,

আমরা কিছু শুনব অপেক্ষায় রয়েছি। আমরা কোনো কথাই বলছি না।

তারপর একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ– বৃদ্ধটির। নাভীপদ্মে সঞ্চিত যেন বহুকালের

গাঁজাময় গেজানো ধোঁয়া সে অসীমে ফুঁকে দিল।

আমি নেইহয়ত ছিলাম’, শুরু হল এইভাবে তার কথা।

সে মরে গেছে কি বেঁচে আছেতা নিয়ে আমরা ভাবছি না তখন।

কে জানেসে হয়ত শেষ থেকে শুরু করেছিল। তবে তার গল্প শুরু হলো সে সময়

যে সময়টিতে কেউ আমরা আর তৈরি নই এই গল্পটি শোনবার জন্য।

কিন্তু শুরুতেই একটি প্রাচীন তরবারির কর্মসিদ্ধির কথা বলেসে আমাদের থমকে

দিয়েছে। তারপর কবেকার ওর জীর্ণ ব্যাগ থেকে রাশি রাশি ঝরা পাতার মতো টাকা

টাকাএকে একেমুঠো মুঠো বের করলআর তাতে আগুন জ্বালাল।

পৃথিবীর যতসব সুগন্ধি বৃক্ষের পত্রপোড়া মাংস আর ধূপগন্ধের মতো,

চন্দন বনের হাওয়ায় কোথায় যেন হারিয়ে গেল সেইসব।

আমরা আবার ব্যাকুল হলাম– কী বলেশুনবো ভেবে ঠিক তখুনি

সে তার পলকা দাড়িতে কিছুক্ষণ হাত বুলালোমাথা থেকে টুপিটি পকেটে নিল এবং

হাসলতীব্র মৃদুস্বরে বলল, ‘এবার তোমরা

তারপর দ্রুত ভিড়ের ভেতর কোথায় সে ডুব দিল

কোনদিনতারপরেতাকে আমরা আর দেখি নি।

                                              — এক বৃদ্ধের গল্প (ভোরের মন্দির ,২১/২২.১১.৯২)

 

আশির দশকের কবি বিষ্ণু বিশ্বাস। ‘ভোরের মন্দির’ এ যে নিজের অমিত শক্তি আর তেজ প্রকাশ করেছিলো কবিতার বেদীতে, কোন সে বিপন্ন বেহাগ তাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো কবিতার মন্দির থেকে। লোকে ঘটা করে এই বিপন্নতার নাম দিয়েছে ‘সিজোফ্রেনিয়া’৷ জীবনানন্দ থেকে বিনয়, বিনয় থেকে বিষ্ণু এমন আরো কত কত কবি ! কিন্তু কেন? কেন লোকালয় ছেড়ে এমন করে কবিদেরই বারবার এইসব অভিজাত অসুখের নাম নিয়ে হারিয়ে যেতে হয়। এ সমাজ, এ  রাষ্ট্র, এ পৃথিবী খুব নীরবে একজন কবিকে খুন করছে নাকি প্রকৃতির এই নিরেট সন্তানদের ধারণ করার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে এই গোছানো সভ্যতার।  নাকি একজন শিল্পী যখন জগতের সন্তান হয়ে যায়, তখন সমাজ রাষ্ট্র তাকে  মেনে নিতে পারে না।

 

বিষ্ণু বিশ্বাস হঠাৎই হারিয়ে গেল। অভিমানী বালকের মত। পথ চিনি তবু বাড়ি ফিরবো না, বন্ধুরা কাছে আসলেও বলবো না সেই অব্যক্ত ক্ষোভ আর কষ্টের কথা। আমি স্রেফ হারিয়ে যাবো- এই কী ছিলো বিষ্ণুর হাহাকার! এই কী ছিলো বেদনার অবয়ব! পারিবারিক জীবনও বড় রহস্যময় ছিলো তাঁর । একদিন বাড়ি ফিরে যে ছেলে দেখে মা তার চলে গেছে অন্য দেশে তখন মানসিক অবস্থা বুঝবার মত সত্যিই কি কেউ ছিলো তাঁর পাশে?কেন এমন করে চলে গেলেন মা? কাউকে হয়তো বলতে পারেননি এমন বেদনার কথা , হৈ হুল্লোড়ে মাতিয়ে রেখেছেন সবাইকে অথচ ভেতরে ভেতরে  কী ভীষণ নিঃসঙ্গ ! শাসন বা সোহাগ , পথের দিশা বা পাথেয় কিছুই তো নেই। তাই হারিয়ে যাওয়াই সহজ মনে হয়েছে  হয়তো।

 

কিন্তু সেই যে ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’র মত কেউ কেউ ভলেনি কবিকে। কবিও তেমনি ভোলেনি তার বন্ধুদের। হেমন্তের সেই গানের মতো,

 

“ফুরিয়ে যাওয়া দিনের আলোর শেষে

আসলো নেমে গভীর অন্ধকার

আধেক খোলা দ্বারের আড়াল থেকে

ভালোবাসার প্রদীপ খানি ধরলো তুলে ধরলো কেউ

দেখা গেলো দুটি নয়ন তার…”

 

তেমনি করে কেউ তার বন্ধু, কেউ তার স্বজন, কেউ তার কবিতানুরাগী, ফুরিয়ে যাওয়া দিনের আলোর শেষে গভীর অন্ধকার নেমে আসার আগেই তাকে খুঁজে পেয়েছে। সন্ধানী বাতাস সীমানা পেরিয়ে তাদের নিয়ে গেছে ইচ্ছে করে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুটির কাছে। অন্তর্ধানের আগের  বিষ্ণু বিশ্বাস কেমন ছিলেন? কবিতা তাকে কতটা গ্রাস করেছিলো ? প্রায় পনেরো বছর পরে ফিরে পাওয়া সেই মুখ কেমন ছিলো? এইসব হাজারো প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আমি তার বন্ধুদের খুঁজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম । কিন্তু সবার কাছে চট করে পৌঁছে যাওয়াটা তো সহজ ছিলো না। তবে সৌভাগ্যবশত দু বাংলার দু’জনকে পেয়ে গেলাম যারা কবির অনেকটাই কাছের ছিলেন এবং এখনো আছেন বলা যায়। ফলত কিছু প্রশ্নের উত্তর আমি খুব নির্ভরযোগ্যভাবে পেয়েছি-এমন দাবি করতেই পারি। বিষ্ণু বিশ্বাসের অগ্রজ বন্ধু ও এককালের সহযোদ্ধা লেখক ও প্রকাশক নিশাত জাহান রানার কাছে যখন গেলাম তখন সমর্পিত বিকেলের বেদনা মাখা রোদ আমার থেকে নিজেকে একটু আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে; অনেকটা কবি বিষ্ণুর মতই। সৌজন্য সংলাপে আমরা খুব একটা যাইনি। কারণ উভয় পক্ষই বিষ্ণুতে বুদ হয়ে ছিলাম। তবু কফি এলো । কথার উষ্ণতায় কফি ঠাণ্ডা হল।

 

কবি বিষ্ণু বিশ্বাসের সাথে পরিচয়ের সূত্রপাত সম্পর্কে জানতে চাই 

 

নিশাত জাহান রানা-  বিষ্ণুকে মূলত চিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন স্বনন থেকে। ১৯৮১ সাল। তখন  সামরিক স্বৈরাচারের সময় স্বননে বেশ সক্রিয় ছিলো। কিছুদিন পরেই বিষ্ণু এলো। এর এক বছর পরেই আমি স্বননের আহবায়ক হয়ে গেলাম। বিষ্ণু আর বিশিষ্ট লেখক ফয়জুল ইসলাম যুগ্ন আহবায়ক হিসেবে এলো। তখন সে ইতিহাসের ছাত্র হলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মত।

 

 বিষ্ণু কী একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করেছিলেন

 

নিশাত জাহান রানা- এখানে কিছু প্রসঙ্গ না বললেই নয়। যেহেতু সামরিক শাসনের সময় রাজনৈতিক আন্দোলন তূলনামূলক কম ছিলো। যা ছিলো সব শ্লোগান, মিছিল মিটিং এ আবর্তিত । তবে এর মধ্যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং তার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদটা বেশ জোড়ালো ছিলো বলা যায়। আমাদের একটা গ্রুপ (সিনিয়র জুনিয়র মিলিয়ে ) যারা লেখালেখিতে তখনই বেশ সক্রিয় ছিলো তার মধ্যে কবি অসীম কুমার দাস (তখন ছাত্র ছিলেন এবং আমার সিনিয়র ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন)  ছিলেন বেশ পণ্ডিত। ফলত তাকে ঘিরে এক গুরুভক্তের দল গড়ে উঠেছিলো যারা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা আচার বিধির বাইরে গিয়ে একটা ভিন্ন স্রোতে চলার প্রবনতা তৈরি করেছিলো। ফলত বিষ্ণুর অনার্সটা শেষ হলেও এম এ না করেই ঢাকায় চলে এলো স্রেফ লেখালেখি করেই জীবন কাটিয়ে দেবে এমন ভাবনায়।

 

ঢাকায় আসবার কতদিন পরে তার ভেতর এই বিষন্নতা বা হতাশা তৈরি হল। 

 

নিশাত জাহান রানা- না, ঢাকায় এসে তৈরি হয়নি।ঢাকায় এসে হয়তো বেড়েছে কিন্তু ওর স্বভাবের মধ্যেই এটা শুরু থেকে ছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকেই তো ওকে চিনি। তখন থেকেই ওর ধরণটা ছিলো আলাদা। সারাক্ষণ গান গাইতো। কবিতা তো লিখতোই। কেমন একটু আলাদা ধাঁচের। আমরা খুব স্নেহ করতাম। কিন্তু ও আর দশজনের মত ছিলো না। ওর রুমমেট যারা ছিলো তারা ওকে আরো ভালো করে জানতো। ধরো কোথায় বেরুবে। বসে আছে তো বসেই আছে। আবার কোথাও গিয়েছে তো উঠবার নামই করছে না। ধরণের মধ্যেই শ্লথভঙ্গি ব্যাপারটা ছিলো।

 

বেশতাহলে আপনার ভাষ্যমতে তার এই উদাসীনতাবিষন্নতা স্বভাবজাত বলেই মনে করছেন আপনি। এমন নয় যে কোন নির্দিষ্ট কারণে এমনটা হয়েছে। এবার একটু কবিতার প্রসঙ্গে আসি। আপনি একজন লেখক এবং একই সঙ্গে প্রকাশক। ‘ভোরের মন্দির‘ আপনার প্রকাশনা থেকেই প্রকাশ পেয়েছে। বিষ্ণু বিশ্বাসের কবিতায় কোন শক্তি বা স্বাতন্ত্র্য স্বর আপনি খুঁজে পেয়েছেন যে কারণে আপনি বইটি প্রকাশে উদ্যোগী হলেন। 

 

নিশাত জাহান রানা- প্রশ্নের উত্তরে আসছি পরে কিন্তু শুরুতেই স্বীকার করে নেয়া ভালো যে ওর লেখার শক্তি বা অসাধারণত্বের কারণে এই বই আমি প্রকাশ করিনি বিষ্ণু আসলে আমাদের এত স্নেহের ছিলো বিশেষ করে আমার যে তার এই হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা ঠিক মেনে নিতে পারিনি। আর নিখোঁজ হবার পূর্বের কিছু ধাপ তো ছিলো যার প্রতিটি অংশের নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি  ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম। তাই ওর এই অন্তর্ধান আমাদের জন্য এতটাই পীড়াদায়ক ছিলো যে এটা মানতে পারাটা খুব কষ্টের ছিলো৷ আমরা জানতেই পারছিলাম না ও বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। এই সময়টায় আমরা যারা ওর পাশে ছিলাম ওর লেখাগুলো জড়ো করছিলাম। মূলত নব্বই দশকের একেবারে শুরুর দিকে ও নিজেই একটা পাণ্ডুলিপি গোছাতে চাইছিলো। ওর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকখানা কবিতা একটা ফাইলের মধ্যে গুছিয়ে কয়েকজনের সাথে আলাপ করেছে যে বইটা করতে চায়। বিষ্ণুর অন্তর্ধানের পরে ওর খুব ছোটবেলাকার এক বন্ধু আমাকে ফাইলটি দেয়। তাতে যে ক’টি কবিতা ছিলো তা পুরো বইয়ের দশভাগের এক ভাগের মত। আমি ওটা নিয়ে রেখে দিলাম। পরবর্তীতে অনেক দিন যখন ওর কোন খোঁজই পাওয়া যাচ্ছিলো না তখন মনে হল অন্তত ওর লেখাগুলো এক জায়গায় থাকুক।এর মধ্যে সাত-আট বছর কেটে গেছে। তখন বিভিন্ন জায়গায় যেখানে যত লেখা ওর প্রকাশ পেয়েছে সব জড়ো করতে শুরু করলাম। এক্ষেত্রে ওর বন্ধুরাও বেশ সহযোগিতা করেছিলো। আরো একটা ব্যাপার ছিলো। শেষের দিকে আমি যখন পত্রিকায় কাজ করতাম তখন প্রায়দিনই এক পাতা দু’পাতা করে লিখে এনে আমার কাছে দিয়ে বলতো,’তোমার কাছে রেখে দাও, নইলে হারিয়ে যাবে।’ এভাবে আমার কাছেও বেশ কিছু কবিতা জমা হয়ে রইলো। পরে এইসব জড়ো করেই বই আকারে তা প্রকাশ করা হল। কাজেই বই করার ব্যাপারে যতটা না ওর লেখার শক্তি নিয়ে ভেবেছি তার চেয়েও বেশি কাজ করেছে তার সৃষ্টিগুলোকে হারিয়ে যেতে না দেয়ার ইচ্ছেটা।

এবার বলি ওর কবিতার শক্তি নিয়ে। ওটা যদি না থাকতো তবে তো এই হারিয়ে যেতে না দেবার ইচ্ছেটাই জাগতো না। কত মানুষ লিখছে, কত লেখা হারিয়ে যাচ্ছে। জগতে কার বা কী এসে যায়। ওরটাও হয়তো যেতো। কিন্তু লেখালেখিটাকে ও সবসময় গুরুত্বের সাথে নিত। সিরিয়াস ছিলো। ওর জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশের মতই ভাবতো। ছাত্রাবস্থায়ই পাঠের অভ্যাসটা খুব ছিলো। তখনই তার কাছ থেকে পরিনত সব কবিতা পেয়েছি আমরা৷ একেবারে নিজের ভেতরে মগ্ন হয়ে যাওয়া বা গহিনে ঢুকে যাবার শক্তিটা ছিলো ওর মধ্যে। আর এটাই ওর লেখায় ফুটে উঠেছে।

 

কবে জানলেন বিষ্ণু বিশ্বাস বেঁচে আছেন? জানার পরে আপনি তাকে দেখতে দত্তঘড়িয়ায় গিয়েছিলেন। কেমন ছিলো সেই সময়ের অনুভূতি? কবি কী আপনাকে চিনতে পেরেছিলেন?

 

নিশাত জাহান রানা- ৯৪ তে হারিয়ে যাবার পর ফের এগারোতে এসে কবির খোঁজ পাওয়া গেল। তার মানে প্রায় ১৬/১৭ বছর পরে । অই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে কেউ একজন কবি বিভাস রায়চৌধুরীর দেয়া পোষ্ট শেয়ার করে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আমি যেই বিষ্ণু বিশ্বাসকে চিনি , উনি সেই কিনা। তার আগে আমরা উড়োউড়ো খবর শুনি ।কখনো শুনি ইন্ডিয়াতে ,কখনো বাংলাদেশের ঝিনাইদহে। এর মধ্যে ওর বইটা বেরিয়ে গিয়েছিলো দু হাজার দশ এ । আমরা বহেরা তলায় গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বইটা নিয়ে একটু মোড়ক উম্মোচনের মত করেছিলাম। হাসান আজিজুল হক স্যারও উপস্থিত ছিলেন কারণ স্যারও বিষ্ণুকে চিনতেন ও স্নেহ করতেন। যখন এই আয়োজনটি চলছিলো তখন ওখানে বেশ কয়েকজন ভারতীয় কবিও ছিলেন। তার মধ্যে একজনের নাম মনে আছে । সুনীল সোনা । পরবর্তীতে তিনি আমাদের এত কথা শুনে বিভাস রায় সহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে রানাঘাটের কাছে দত্তফুলিয়াতে কবিকে সনাক্ত করেন। তবে শত চেষ্টা করেও বিষ্ণুকে দিয়ে কথা বলানো সম্ভব হয়নি। ওর চিকিৎসা যারা করছিলেন তারাও বললেন, অপরিচিত কারো সাথে কথা বলছেন না । কিন্তু পরিচিত কাউকে পেলে হয়তো কথা বলবেন। তখন আমি বিষ্ণুর কাছে যাবার প্রস্তুতি নেই। আমাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গেই চিনে ফেলেছিলো। আসলে এত বছর পরে সেই দেখার অনুভূতি বুঝিয়ে বলার নয়। আমিও কেঁদে ফেলেছিলাম বলতে গেলে। চেনার উপায় ছিলো না। ইয়া লম্বা লম্বা দাড়ি। বড় বড় নখ। সবচেয়ে কষ্ট লেগেছিলো স্বাস্থ্যটা একদমই ভেঙে গিয়েছিলো।

 

যতদূর দেখেছি সোশ্যাল মিডিয়াতে তখন তাকে নিয়ে বেশ উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। আপনি এর মধ্যেই গেলেন?

 

হ্যাঁ । আমাকে তো নানারকম তথ্য দেয়া হচ্ছিলো। দু তরফের বাকবিতণ্ডা আর উত্তেজক কথাবার্তায় মনে হচ্ছিলো এক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়ে গিয়েছে । এ ওকে গাল দিচ্ছে , ও তাকে গাল দিচ্ছে। সে এক মহা হুলস্থুল। কেউ বলছে ,যে স্ব-ইচ্ছায় এ জীবন বেছে নিয়েছে তাকে কেন আবার ফিরিয়ে আনা। কেউ টেনে আনলো মৌলবাদ প্রসঙ্গ। কেউ এটাকে রাজনৈতিক চাল হিসেবে ভাবলো। নানা মুনির নানা মত আর কি। যাই হোক অবশেষে বাংলাদেশ থেকে আমি,নাহার (বিষ্ণুকে আগে থেকেই চিনতো নাহার ) গেলাম। ওদিক থেকে কবি মৃদুল দাসগুপ্ত, কবি গৌতম চৌধুরী আর ওদিকে কবি বিভাস রায় সহ আরো বেশ কয়েকজন ছিলেন। আমার উচিৎ ছিলো তখনই লিখে রাখা। এত বছর পরে স্মৃতি থেকে বলা বেশ কঠিন।

 

আপনি তো ফের কবিকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। আনার পরে তার কোন পরিবর্তন চোখে পড়েছিলো কী?

 

হ্যাঁ। আমার কাছেই ছিলো। এখানে আনার পরে প্রথম কাজ ছিলো কাউকে কিছু না জানিয়ে ওর কাছের কিছু মানুষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ওকে একটু স্বাভাবিক করিয়ে নেয়া। ওরা এসে গল্প করতো, ওর সাথে সময় কাটাতো। দ্বিতীয় কাজ ছিলো ওর আইডি পাসপোর্ট এসব ঠিকঠাক করে দেয়া যাতে ও যখন যেখানে ইচ্ছে আসতে যেতে পারে। এসব করতে যে হ্যাপা করতে হল তা আর বলবার নয়। কারণ ও তো কথা বলে না। পুলিশ, প্রশাসন রীতিমতো তাকে পাগল ভেবে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। এরপর যদি মিডিয়া জানতো তাহলে তো আরো চাপ তৈরি হত। আমি এসব হৈচৈ চাইনি। তাতে ওর মানসিক অবস্থার আরো অবনতি হতো ৷ আমি চেয়েছিলাম চারপাশের পরিবেশটা স্বাভাবিক রেখে যতটা ওকে ওর মত করে রাখা যায়। রোজ কাগজ কলম দিতাম। বলতাম, ‘কিছু লেখ’। চুপ করে থাকতো। এক-দীর্ঘদিনের না লেখার অভ্যাসে লেখার চর্চাটা ভেতর থেকে আসছিলো না। দুই- শারীরিক অক্ষমতা। আঙুলগুলো কেমন বাঁকা হয়ে অসাড় হয়ে ছিলো। কলম ধরতে পারতো না ঠিকঠাক। এরপর কম্পিউটারে বাসানোর চেষ্টা করলাম। যাদি বাটন টিপে টিপেও কিছু লিখতে পারে। প্রথমে তো ভয়ে কম্পিউটারের কাছেই যেত না। ওর ধারণা ছিলো এটা ভিন গ্রহ থেকে আসা কোন এলিয়েন। অনেক সময় লাগলো এটাতে অভ্যস্ত করাতে । এভাবেই বলা যায় অনেকটা জোর করে লেখানো।

 

কবির দ্বিতীয় বইটা কবে নাগাদ পাচ্ছি ? বইটার নাম জানতে পারি?

 

নিশাত জাহান রানা- আশা করছি আগামী বইমেলার আগে। নামটা সম্ভবত (যদি আমি গোলমাল করে না থাকি)  ‘তোমার থেকে দূরে এসেছি।‘

 

এখনো কথা হয়?

 

নিশাত জাহান রানা- কথা তো ওটুকুই। হু হা বা সামনে থাকলে মাথা নাড়ানো । আগের যে বিষ্ণুর গল্পই শেষ হত না, রিহার্সালে বকবক করে মাথা খেয়ে ফেলতো, সারাদিন পারলে কথা বলে সেই বিষ্ণুকে আর খুঁজে পাই না।

 

*****

ঝিনাইদহ সরকারি কে সি কলেজ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ, সেই সময়কার  স্বনন এর তারকা আবৃত্তিকার থেকে পেঁচার সম্পাদক বিষ্ণু বিশ্বাস বন্ধুদের ভাষ্য  অনুযায়ী সদালাপী, আড্ডাবাজ, পোষাকে পরিপাটি। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, নিয়মে বাঁধা জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা আর ছকের বাইরে চলা যাপন ছিলো তার মজ্জাগত। কবিদের কোন নিয়মে বাঁধতে নেই- এই ভাবনা তাড়িয়ে নিতে নিতে এক বোহেমিয়ান দর্শনের দিকে তাকে ধাবিত করেছে।  করতে করতে ঝিনাইদহ থেকে রাজশাহী, রাজশাহী থেকে ঢাকা ,ঢাকা থেকে রানাঘাট বা দত্তফুলিয়া ,আবার বাংলাদেশ,আবার ইণ্ডিয়া কত দিকেই না নিয়ে গেল! আমিও তাই তার পথ ধরেই বাংলাদেশের  লেখক নিশাত জাহান রানার কাছ থেকে চলে গেলাম ভারতবর্ষের বাংলা ভাষার আরেকজন শক্তিমান কবি বিভাস রায়চৌধুরীর কাছে । এবার তাঁর কাছে চললো আমার তত্ব তালাশ ।

 

কোথায় খুঁজে পেলে তাকেতোমার সাথে যোগাযোগটা কিভাবে হল একটু বলবে আমাদের

 

বিভাস রায়চৌধুরী – আমি ২০০০ কি২০০২ সালে  বাংলাদেশের বইমেলাতে গিয়েছিলাম আমার ভাই সুনীল সোনার সাথে। ওখানে আমার সাথে আলাপ হয় খলিল মজিদ, সেঁজুতি বড়ুয়া  সহ আরও বেশ কয়েকজন কবি লেখকের সাথে। মূলত তাঁদের মাধ্যমেই জানতে পারি আটের দশকের এক শক্তিমান কবি বিষ্ণু বিশ্বাসের  কথা। যাকে অনেক দিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তাঁর মায়ের বাড়িতে চলে গিয়ে থাকতে পারেন এমন ধারণা করা হচ্ছিল। তুমি জানো আমি বনগাঁতে থাকি। এর বেশ কয়েক বছর পরে দত্তফুলিয়া থেকে রানাঘাটের পথে একটি জায়গায় কবি তাঁর মায়ের কাছে আছেন, খবর পাই। যিনি প্রতিদিন  সন্ধের পরে ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েক মাইল হেঁটে দত্তফুলিয়া বাজারে এক চায়ের দোকানে আসেন, চা-সিগারেট খান, ইংরেজি খবরের কাগজটা পড়েন। কার‌ও সঙ্গে কথা বলেন না। এটুকু তথ্যের উপর ভিত্তি করেই আমি, কবি সুনীল সোনা সহ আরও বেশ কয়েকজন স্থানীয় লেখকবন্ধু অনেক খুঁজে খুঁজে তার বাড়িটি বের করি। সুনীলের আবার দূর-সম্পর্কের আত্মীয় বিষ্ণু বিশ্বাস। আমার তখন মানুষটাকে দেখে মনে পড়ে যায় সেই ১৯৮৬ সালে দেখা অসুস্থ বিনয় মজুমদারকে।   মাথাভর্তি চুল, মুখভর্তি দাড়ি বিষ্ণু বিশ্বাস একটিও কথা বলেননি প্রথম দিন। তাঁর মা-ই শুধু চোখের জল ফেলতে ফেলতে দুর্ভাগ্যের কথা বলেছিলেন। ফুল বেচে তার সামান্য উপায়। তার মধ্যে অসুস্থ ছেলে এরকমভাবে ঘরে পড়ে থাকে। জেনেছিলাম বিষ্ণু বিশ্বাসের মা বাংলাদেশের জমি বেচে এপারে আত্মীয়ের পাশে চলে আসেন। বিষ্ণুদার বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি বাপের বাড়িতে থাকতেন। বিষ্ণুদা প্রথমে রাজশাহী, পরে ঢাকায় থাকতেন। এপারে তাঁর মা চলে আসার পর হঠাৎ একদিন বিষ্ণুদা এখানে হাজির। কিন্তু অসুস্থ ও নীরব।  এভাবেই বিষ্ণুদাকে খুঁজে পাওয়া। পরে শুনেছি আমরা যাওয়ার আগে কবি তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও আর‌ও  কয়েকজন খোঁজখবর নিতে এসেছিলেন। কিন্তু ওই খোঁজ নেওয়া পর্যন্ত‌ই।

 

প্রথমদিন কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল

 

বিভাস রায়চৌধুরী – অই যে বললাম, তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা হল। দেখলাম একটা মাটির বাড়ি, মাথার উপরে টিনের চাল আর ঘরের মধ্যে অনেকগুলো কুকুরের ছানা, বিড়ালের ছানার মধ্যে লম্বা  একজন মানুষ বসে আছেন। মাথাভর্তি চুল, মুখভর্তি দাড়ি। আমি তাঁর মাকে বললাম যে আপনার ছেলে বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত কবি। তাঁর বন্ধুরা তাঁকে খুঁজছেন। তখন তাঁর মা এসব বলেকয়ে তাঁকে বাইরে এনে বসান। আমি তাঁর একটি ছবি তুলি। কিছু প্রশ্ন করি। তিনি আমার কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দেননি। মৌন ছিলেন। তখন ভেবেছিলাম তাঁকে নিয়ে কবিতা আশ্রম থেকে একটা সংখ্যা করব, তখন আমার তোলা এই ছবিটা ব্যবহার করব। কিন্তু বাড়ি ফিরেই ভেতর থেকে একটা তাড়না অনুভব করছিলাম মানুষটার জন্য কিছু একটা করার।  যেহেতু অসুস্থ বিনয় মজুমদারকে দেখেছি, পূর্ব-অভিজ্ঞতা আমার ছিল, তাই বিষ্ণু বিশ্বাসের মানসিক অবসাদগ্রস্থতা বুঝতে আমার খুব একটা সময় লাগেনি। আমি তখন সোশ্যাল  মিডিয়ায় একটা আবেদন জানাই যে বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত কবি এই অবস্থায় আছেন। যদি কোন‌ও  সহৃদয় বন্ধু বা স্বজন তাঁর কোন‌ও উপকারে আসতে পারেন তাহলে বিশেষ উপকার হয়। তখন কবিতাসূত্রে আমাদের বন্ধু ডা. তটিনী দত্ত ও তাঁর স্বামী ডা. গৌতম মুখোপাধ্যায়… দু’জনেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ… স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে জানালেন যে এই কবির চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব তাঁরা নেবেন।

 

তটিনী দত্ত  গৌতম মুখোপাধ্যায় কোথায় থাকেনআর মূল যে ব্যাপারটা জানতে চাই ওই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষ্ণু বিশ্বাসকে নিয়ে বেশ একটা হৈচৈ শুরু হয়। বেশ কিছু ইতিবাচক  নেতিবাচক কথাও তৈরি হয়।  বিষয়টা পরিষ্কার হতে চাইছি তোমার কাছে৷ 

 

বিভাস রায়চৌধুরী – গৌতমদা-তটিনীরা কল্যাণীতে থাকেন। তখন আমাদের সাংবাদিক বন্ধু চঞ্চল  পাল, কবি মিতুল দত্ত ও আর‌ও কয়েকজন কবিবন্ধু এগিয়ে আসে। মিতুল বাংলাদেশের বন্ধুদের জানায়। আমিও ফেসবুকে পোস্ট দিই। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে কিছু লোক খুব বাজে প্রচারণা চালায় যে বাংলাদেশ থেকে মুসলিম মৌলবাদীদের আতঙ্কে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া কবি বিষ্ণু বিশ্বাসকে জোর করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চাইছি আমরা। কারণ বাংলাদেশে লেখক-কবিদের কাছে নিজেদের প্রতিষ্ঠার লোভ। শুরু হয় দুই দিক থেকে বাদানুবাদ। প্রথমে চমকে গিয়েছিলাম। এমন যে হতে পারে বুঝতে পারিনি। তারপর আমি মনস্থির করি কবিকে  সুস্থ করে তুলতে হবে আগে।   ফেসবুকে তর্ক তোলা আর মাটিতে নেমে কাজ করা এক নয়। একজন কবি সে বাংলাদেশের নাকি ইন্ডিয়ার এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না আমার কাছে ৷ এক্ষেত্রে চিকিৎসক দম্পতি গৌতমদা-তটিনী  অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। কবির চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে পথ্য নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ করা–যাবতীয় দায়িত্ব তাঁরা নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে মানুষটাকে সুস্থ করার চেষ্টায় সার্বক্ষণিক রত ছিলেন। এর কয়েক মাস পরে কবি মৃদুল দাশগুপ্ত, কবি গৌতম চৌধুরী,  যারা বিষ্ণু বিশ্বাসকে আগে থেকে চিনতেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন এবং বিষ্ণুদা তাঁদের চিনতে পারলেন। এতে চিকিৎসায়ও কিছুটা সুবিধে হয়। এরপরে নিশাত জাহান রানা ও আর‌ও একজন, খুব ভাল গান করেন, নামটা এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না, তাঁরা আসেন।  বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের দেখে  কবি বেশ উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। গায়িকার গানের সময় কবির চোখ ভিজে উঠেছিল। এরপর  সবাই আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকলেও সাংবাদিক চঞ্চল পাল আর দুই ডাক্তার দম্পতি সবসময়েই কবির খেয়াল রাখতেন। ধীরে ধীরে কবি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠতে থাকেন। বেশ কিছুদিন পরে রানাদি কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করলেন। যদিও এই যাবার ব্যাপারে ডাক্তারের সম্মতি ছিল না। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যেটুকু উন্নতি হয়েছে, তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।  কিন্তু যেহেতু আমরা বাইরের লোক, কবির পরিবারের কেউ ন‌ই, আমরা বিষয়টায় চুপ ছিলাম।   কিছুকাল পরে রানাদির মেসেজ থেকে জানতে পারি বিষ্ণুদাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

এরপরে কী উনি বাংলাদেশেই থাকতে শুরু করলেন আবার

 

বিভাস রায়চৌধুরী – বাংলাদেশে নিয়ে যাবার পর রানাদি’র একটা ম্যাসেজ পেয়েছিলাম । তাঁদের কথা ছিল যেহেতু বিষ্ণুদা  বাংলাদেশের নাগরিক, তাঁকে পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র করিয়ে দিলে উনি আইন মেনেই উভয় দেশে যাতায়াত করতে পারবেন। অন্তত অবৈধ অভিবাসী হিসেবে তাঁকে কোথাও থাকতে হবে না

এটা বেশ ভাল একটা কাজ মনে হল আমার কাছেও। যাই হোক, এর বছর দেড়েক পরে আমি দত্তফুলিয়ার দিকে যাই একটি সাহিত্য আয়োজনে। গিয়ে অবাক হয়ে দেখি বিষ্ণু বিশ্বাস সেখানে বসে আছেন। আগের চেয়েও আর‌ও কুঁজো হয়েছেন, স্বাস্থ্যও ভেঙে গেছে, মুখে দাড়ি। কথা বলার চেষ্টা করি। দেখলাম আমায় চিনতে পারলেন। মৃদু কিন্তু গমগমে গলায় সবার কুশল জানতে চাইলেন। আমার বাড়িতেও আগে গৌতমদা-তটিনীর সঙ্গে  তিনি এসেছিলেন।

বর্তমানে তাঁর কবি পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে এদিকেও। নানা সাহিত্য আয়োজনে  লোকজন ডাকে তাঁকে। কবি হিসেবে সম্মান পান। কেউ কেউ পারিশ্রমিক‌ও দেন।  মায়ের কাছে যে বাড়িটাতে আছেন, সেটা স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা সকলে মিলে কিছুটা ঠিকঠাক করে দিয়েছেন বলে শুনেছি। আমার যাওয়া হয় না।  দুই ডাক্তার নিয়মিত তাঁর ওষুধ ও টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিস পাঠিয়ে দেন আজও। আমি বা আমরা আসলে এর বেশি কিছু করতে পারিনি তাঁর জন্যে।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বের হচ্ছে।  বিষয়ে তোমার কিছু জানা আছে কি

 

বিভাস রায়চৌধুরী – আসলে চিকিৎসার অংশ হিসেবেই গৌতমদা-তটিনী  কাগজ কলম কিনে দিয়ে লিখতে বলতেন কবিকে। তিনিও নানা রকম লিখতে শুরু করেন। এগুলো আমি দেখেছি। রানাদি’ বাংলাদেশে নিয়ে যাবার পর লিখতেন হয়তো, আমি জানি না। বিষ্ণু বিশ্বাসের নতুন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে খুবই ভাল হবে। তবে  আমার কাছে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বের হবার পাশাপাশি তাঁর উন্নত জীবন ও চিকিৎসাকেও জরুরি মনে করি৷

 

এবার বিষ্ণু বিশ্বাসের কবিতা নিয়ে কিছু কথা হোক। মানে ‘ভোরের মন্দির‘ নিয়ে। 

 

বিভাস রায়চৌধুরী – বিষ্ণুদার কবিতা জীবনানন্দ ঘরানার। এর মানে এই নয় যে তিনি জীবনানন্দকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেছেন।

 

তবে কী

 

বিভাস রায়চৌধুরী – অনুকরণ নয়, যে অর্থে বিনয় মজুমদার নিজেকে  জীবনানন্দের সন্তান বলেছেন, সেই অর্থে বিষ্ণু বিশ্বাসকেও জীবনানন্দ – বিনয়ের কবিতাধারার উত্তরাধিকারী বলা যায়। বিষ্ণুদার কবিতার ক্ষেত্রে বলব এমন কবিতা লিখতে গেলে এক ধরনের উন্মত্ত ভাবাবেগ দরকার হয়। ঠান্ডা মাথার নির্মাণ-নৈপুণ্য নয়। উদাসীন ভাসমান তীব্রতায় খচিত আত্মলিপি। ‘ভোরের মন্দির’ একজন শক্তিমান কবির সৃষ্টি।  তবে কী জানো তো এমন ভাবাবেগ আশ্রিত কবিতায় আত্মনিয়ন্ত্রণ খুব জরুরি। নইলে ভেসে যেতে হয়। বিষ্ণুদার ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই ঘটেছে বলে মনে হয়। এটা ভাল বা খারাপ কিছুই বলছি না। আমি বলব এটা বিষ্ণু বিশ্বাসের মতো কবিদের  বৈশিষ্ট্য।

*****

কবির কথাটি ফু্রালো, নটে গাছটি মুড়ালো। কিন্তু কই মুড়ালো ? আমার যে বলার রয়ে গেল অনেক কিছু শুরুর কবিতার মত। ব্যক্তিগত আবেগ, একটা ঘোরের মধ্যে সর্বদা নিজেকে ফেলে রাখলে  কবি যাপন যেমন যথার্থ মর্যাদা পায় না তেমনি কবিতাও হয়ে পড়ে অতি আবেগাক্রান্ত, নয়তো বক্তব্যহীন। কিন্তু বিষ্ণুর কবিতা তো তেমন নয় । আমি ভোরের  মন্দির তুলে দিয়েছিলাম তরুন প্রজন্মের কিছু আশা জাগানিয়া কবির হাতে। মূল কারণ তারা বিষ্ণুর কবিতায় কী পাচ্ছে? প্রত্যেকেই বিস্মিত ও ভাবিত। তাদের প্রথম প্রশ্নই ছিলো ,এমন ঘোরলাগা কবিতা যিনি লিখতে পারেন তিনি কেমন করে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। মানুষ মাত্রই যে কোন বৈকল্যের শিকার হতে পারে কিন্তু শুরুতেই কেন সেই বৈকল্যবীজ উপড়ে ফেলা হয়নি। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, মানসিক ভারসাম্যহীনতা কিংবা সাহিত্যের নিম্নমানের রাজনীতিতে নিষ্পেষিত হয়ে আর কত বিনয় ,বিষ্ণুকে আমরা হারাবো ? প্রকৃতির সন্তান আর প্রকৃত কবিদের এভাবে হারিয়ে ফেললে কবিতা টিকে থাকবে তো ? কে জানে!

 

আমরা শুধু জানি ‘দুপুরের রোদ গায়ে মেখে’ আমাদের আরো কয়েকটি ভোরের মন্দির পাওয়া হল না। পেঁচার পরবর্তী সংখ্যাগুলো দেখা হল না। এত যে নেতিবাচকতা , তবু কী কেউ শোনাবে না-

 

‘হয়ত থামতে হবে, বহুবার অনাত্মীয় শোকে/…দ্বিতীয় ঈশ্বর তবে তৃতীয় ঈশ্বর জন্মদানে / আবার মিলিত হবে সোনালি জামা হলুদ গন্ধে। /এই অনুবর্তনের গল্পে যে পথে গিয়েছে ধূলিপথ / ডানে বাঁয়ে সবখানে জাম আম সবুজ কথক / আমাকে পেরিয়ে গেলে নিশ্চিন্ত কল্পতরুর গাছ।’