You are currently viewing দুজনে দেখা হলো ||  লিপি নাসরিন

দুজনে দেখা হলো || লিপি নাসরিন

দুজনে দেখা হলো
লিপি নাসরিন

অফিসে থাকতে থাকতেই তাকে ফোন করলাম। বললো বের হয়েছে আমি যেন অপেক্ষা করি। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমি অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগলাম স্বভাববশত। সামান্য একটু পথ কিন্তু এতো সময় লাগছে কেন বুঝতে না পেরে আবার ফোন করলাম। বললো এসে গেছে প্রায়। আমি অফিস থেকে বের হয়ে মসজিদের পাশে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে এ-পথ ও-পথ তাকাতে লাগলাম। নাহ, দেখা মিলছে না অথচ দশ মিনিটের পথ। আবার ফোন দিলাম রিং হয় কিন্তু সে ফোন ধরে না। ফোন কেটে যেতেই আবার কল দিলাম , এভাবে কয়েকবার। কোন সাড়া শব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ ভাদ্রের গরমে ঘামছি আর বিরক্তি বাড়ছে। একবার ভাবলাম চলেই যাই দেখা না করে কিন্তু চব্বিশ বছর পর দেখা হবে অথচ থাকি দেড় ঘন্টার দূরত্বে তাই কিছুটা কষ্ট সহ্য করে এক পা দুপা সামনে পিছে করে অপেক্ষায় আছি। অবশেষে আমার প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সে ফোন করে জানালো আমাকে নাকি দেখতে পাচ্ছেন মাঠের কোণা থেকে অর্থাৎ আমি বুঝলাম সে মাঠের কোণা পর্যন্ত পৌছেছে। আমি তাকে ঐখানটাতে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে নিজে এগিয়ে গেলাম। তবে তার সংগে ফোনালাপে বুঝলাম চব্বিশ বছরে তার কোন পরিবর্তন হয়নি, সেই একই রকম অল্পবুদ্ধির মানুষ রয়ে গেছে গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে ক্যাবলা। তবে খুব ভালো এই মানুষটি। তার ফোন নম্বর পেয়ে যেদিন ফোন দিয়ে নিজের নাম বললাম সে তো অবাক। বারবার বলছিল কবে আমাকে দেখবে, হাতে হাত মেলাবে আর বুকে জড়িয়ে ধরবে।
আমি মাঠের দক্ষিণ কোনটাতে এসে দেখি সেখানে কেউ নেই। সে তো বোরকা পরে সেই মাদ্রাসায় পড়া থেকে তাই বোরকা পরা যতো মহিলা যাচ্ছে আমি খুব করে তাদের নেকাবের উপরে থাকা চোখ দুটোয় চোখ রাখছি দাঁড়িয়ে থেকে। এক একটা ইজিবাইক আর ভ্যান গাড়ি আমাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে আর ভাবছি এই বুঝি সে নামলো। কিন্তু আমার অপেক্ষা কেবল দীর্ঘয়াতি হচ্ছে আর সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের দীর্ঘায়তনে বিরক্তি বাড়ছে রাস্তার ধারে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাতে। রোদ নেই, ভ্যাপসা, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া পরিবেশকে যেন অসহ্য করে তুলেছে। আশেপাশের দোকানের মানুষ, রাস্তার পথচারি তাকিয়ে এক নজর দেখে নিচ্ছে আমাকে। হঠাৎ আমার নজর গেলো একটু দূরে সোজা রাস্তার উপর, দেখি হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে ধীরে সুস্থে কে একজন হেঁটে হেঁটে আসছে। ছুটন্ত, চলন্ত পথচারিদের ভেতর থেকে সেই একজন আমার নজর কাড়লো, তার হাঁটার ভঙ্গিমাও খুব চেনা মনে হলো। আরো একটু কাছে আসতেই বুঝলাম সে দেখা দিয়েছে। রাস্তার ওপাশে সে দাঁড়িয়ে আর এ পাশে আমি। অনেক যে চওড়া রাস্তা তা নয় কিন্তু পার হতেই সে গলদঘর্ম হলো। শেষ পর্যন্ত এ পাশ ও পাশ তাকিয়ে পার হয়ে কাছে আসতেই আমি জড়িয়ে নিলাম আমার বুকের সাথে আর বললাম, আপনি এখনো আগের মতোই আছেন, একটুও বদলাননি। হেসে জবাব দিলো, আপনিও তো বদলাননি। কিন্তু আমি তার কোন বদলানো প্রসঙ্গে বললাম সে বুঝতে পেরেছে বলে মনে হলো না। শরীরে সে বেশ বদলেছে। আমি তার নেকাব সরানো চোখ দুটো দেখলাম। আগের থেকে বেশ বড় লাগলো আমার কাছে, যেন অক্ষিগোলক থেকে বেরিয়ে আসছে কথা বলার সময়, কথা শেষ হলে আবার ফিরে যাচ্ছে নিজের ভিতর। চিবুক একটু ফোলা। পান খাওয়া ঠোঁট দুটোর পরম্পরা অসম। ছোট-বড় দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা দাঁতগুলোর ফাঁক দিয়ে তার লাল জিহ্বা দেখা যাচ্ছিল। আমি খুব নিরিখে খুঁজছিলাম চব্বিশ বছর আগে ফেলে আসা আমাদের সেই ছোট্ট দুতলা দুটো খাটের রুমটিকে। যার একটি খাটে ঘুমাতো সে আর একটি খাটে আমি, না আমি একা না ,আমার সাথে থাকতো আমার সদ্য তৈরি হওয়া গর্ভস্থিত ভ্রূণ। পুরো একটা বছর ছুটির দিন গুলো বাদে আমরা একই সাথে ছিলাম। সেই দিনগুলোতে সে আমাকে খুব যত্নে রাখতো। রাতে আমার ওয়াশরুমে যাবার প্রয়োজন হলে সাথে যেতো। আমাকে সে সেভাবেই নির্দেশনা দিয়েছিল, যেন কিছুতেই তাকে না ডেকে আমি রাতের বেলা ওয়াশরুমে না যাই। কতো কথা মনে পড়ছিল আমার! তার শরীর গতো চব্বিশ বছরে সামান্য বেড়েছে, তার চোখে আমিও শরীরে বেড়েছি নিশ্চয়ই কিন্তু নিজের পরিবর্তনটা পাশের মানুষ তেমন দেখতে পায় না দূরের কেউ একজন অনেকদিন পর যেমন পায়। প্রাথমিক আবেশ কাটিয়ে উঠে বললাম, চলুন আমরা কোথাও বসি, কথা বলি, অনেক কথা আছে।
সে সানন্দে রাজি হলো। তাঁর হাতের কাপড়ের ব্যাগটা আমি নিতে চাইলাম তার কষ্ট লঘু করার জন্য কারণ তাঁর সাথে ফোনালাপে জেনেছিলাম সে নানাবিধ অসুখে অসুখী কয়েক বছর ধরে। কিন্তু সুযোগটি আমাকে না দিয়ে সে উঠে গিয়ে বসলো। ইজিবাইকের চলার শব্দ আর রাস্তার যানবাহনের শব্দে কথার অধিকাংশ অশ্রুত থাকবে ভেবে দুজনেই ফোন বের করলাম। আমি আমার সেই গর্ভস্থ ভ্রুণের পূর্ণাঙ্গ মানবরূপের ছবি তার চোখের সামনে মেলে ধরলাম। সে তো অবাক! অস্ফুট ধ্বনি তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, সময় কীভাবে ফুরিয়ে যায়! আমি যেন একটু সরে গেলাম আমার অবস্থান থেকে। ইদানীং আমার তাই হয়। এতো দ্রুত আমার মানসিক অবস্থান বদলে যায় ঠিক শীত ভোরের সূর্যের মতো। উঠতে উঠতে কখন মাঝপথে চলে আসে।
আমার কথা থাক,তার কথা বলি। মেলার কাছাকাছি এসে নামলাম দুজনে। জোহরের নামাজের সময় তাই তেমন ভিড় না। মেলায় যা হয়- অধিকাংশ খাবারের দোকান উন্মুক্ত, বসার ব্যবস্থা বাইরে কিন্তু আমরা চাচ্ছিলাম একটু ঘেরাটোপে বসতে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলাম একটা কাপড়ঘেরা অস্থায়ী শেডের দোকান। কোণার দিকে গিয়ে দুজনে বসলাম। সেই শুরু করলো, আমার তো আর বাচ্চা-কাচ্চা হবে না, বয়স প্রায় যাট হতে চলেছে । আমি এতোক্ষণে তার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে চাইলাম। অনেক আগে শুনেছিলাম সে আবার বিয়ে করেছে। হয়তো সে-ই প্রথম দিকে বলেছিল আমাকে। মাদ্রাসায় পড়াকালিন সময়ে তার প্রথম বিয়ে হয়েছিল কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি। সে মানুষটা ভালো ছিলো না বলে চব্বিশ বছর আগে শুনেছিলাম। ও খুব সহজ মানুষ, জীবন যে জটিল খুব করে তার জানা আছে তাই জটিল জীবনের অবগাহনে সহজ মানুষের ক্লান্তি খুবই দৃশ্যমান ছিলো তার কাছে। বললাম, দুলাভাই মানে আপনার বর কোথায়? মুখে পানের মসলা তিন আঙুলের ডগা দিয়ে ফেলতে ফেলতে বললো, নামাজ পড়ে আসবে, আমরা আপনার সাথে দেখা করেই বাড়ি ফিরবো। আমার একটু বিশেষ ঝোঁক ছিলো তার বরের বয়স নিয়ে, কারণ আমি জেনেছিলাম তার বরের বয়স চলমান সময়ের বাস্তবতায় মেলে না। এবার পান চিবতে চিবতে সে ব্যস্ত হয়ে পড়লো আমার ভবিষ্যত নিয়ে। আমি একা একা কেন এতোগুলো বছর পার করে দিলাম সেটিই তার অভিযোগ। বললাম, এই তো ভালো আছি, জীবনে কোন তাড়াহুড়ো নেই এখন আর, সন্তানও আমার আঁচল ছেড়ছে অনেক আগে, আর কটা বছর চাকরি আছে তারপর হাত-পা ঝাড়া মানুষ; দুনিয়া দেখতে দেখতে একদিন চলে যাবো।
এমন করে বলবেন না, আমি আপনাকে এক বছরে খুব ভালো করে চিনেছি। এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। তার এই কথা শুনে আমি সেই ঘেরাটোপে খুব জোরে হেসে উঠি। দোকানদার আমাদের দিকে তাকায়। আমি সতর্ক হই।
আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে কী এমন হয়েছিল যে এতো সুন্দর জীবনটা নষ্ট হয়ে গেলো?
সেটি তো আপনারাই ভালো জানবার কথা যে, আসলে কী হয়- আমি যেন ভেতরে ভেতরে একটু অস্বস্তি টের পাই। সহজ হবার চেষ্টা করে বললাম, তা শুনেছিলাম আপনার বরের আগের পক্ষের ছেলেমেয়ে আছে, তারা কি আপনাদের সাথে থাকে?
সে বেশ হতাশার সুরে বললো, না তারা তাদের মায়ের সাথে থাকে। আমি কোন কথা না বলে অর্ডার দেওয়া ফুসকা মুখে পুরে দিতে দিতে বললাম, নিন ,খান।
আমি পান চিবুচ্ছি, পরে খাবো
আমি হেসে বললাম, পান তো আপনি ত্রিশ বছর আগে থেকে চিবোচ্ছেন এখন না হয় ফুসকা খেলেন, ক্ষতিতো কিছু নেই। সে ততক্ষনাৎ মুখের পান ফেলে দিয়ে জল দিয়ে কুলি করে ফুসকা খেতে উদ্যত হলো।
এর মধ্যে বারকয়েক তার মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। কথার ধরন শুনে বুঝলাম তার বরের ফোন। প্রতিবারই সে তার লোকেশন জানিয়ে দিচ্ছিল। আমাদের ফুসকা খাওয়া শেষ হলে আমরা আরো কিছুক্ষণ বসে রইলাম তার বরের আসার অপেক্ষায়। বিগত সেই এক বছরের কতো রোমান্টিকতা নিয়ে রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। এক সময়ে দুজনে উঠে পড়লাম। মেলার ভেতর ঘুরে ঘুরে নানান প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঘাটছিলাম নিতান্ত অপ্রয়োজনে। দুপুর পড়ে আসতে লাগলো আর আমার তাড়া বাড়তে লাগলো কারণ বাসায় ফিরে আমার রান্না করে তারপর খেতে বসতে হবে। হাটতে হাঁটতে আমরা মেলার একেবারে শেষ প্রান্তে চলে এলাম ; তখনই তার ফোনটা আবার বেজে উঠলো। তার কথায় বুঝলাম তার বর আশে পাশেই আছে, দু-দশ মিনিটের মধ্যেই হয়তো আমাদের সম্মুখে হাজির হবেন।
হঠাৎ তার হাতটা ধরে আমি বললাম, আচ্ছা আপনাদের পরিচয় হয়েছিল কীভাবে আর প্রায় বৃদ্ধ একটা মানুষের সাথে আপনার প্রেমই বা হয়েছিল কীভাবে। সে নরম প্রতিবাদের সুরে বললো, না, না তিনি বৃদ্ধ নন দারুণ রোমান্টিক মানুষ! তারপর ঠোঁটে হাসির রেখা দুপাশে টেনে দিয়ে পুনরায় বললো, এই তো এলো বলে, আপনি তার কাছে শুনে নেবেন। আমিও মৃদু হেসে তার হাতটা ছেড়ে দিই। সে আর আমি দুজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, একসময় তার দৃষ্টিতে- আমার উপর থেকে সরে গিয়ে আমার পিছনে কারো উপর পড়লে হাসির ঝিলিক বয়ে গেলো। আমিও তার মুখের উপর থেকে চোখ ফিরিয়ে পিছনে তাকালাম। কিন্তু আমার সেই দৃষ্টি এতো পিছনে ফিরে গেলো যে আমার সামনের জমজমাট মেলা অদৃশ্য হয়ে গিয়ে এক বিরান শূন্য মাঠ পড়ে রইল আর আমি একা সেই বিরান মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রোদে ভিজে যাচ্ছিলাম দরদর করে।
আমার পায়ের তলা থেকে কে যেন মাটি সরিয়ে নিচ্ছিল আর আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে।
এই আমার সেই বান্ধবী যার কথা তোমাকে বলেছিলাম, আমাকে দেখিয়ে সে পরিচয় করিয়ে দিলো। তিনি আমাকে সালাম দিলেন। আমি সালামের উত্তর দিতেই তিনি বললেন, আপনাকে দেখার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। আপনার ভীষণ প্রশংসা করে ও। যাক, দেখা হয়ে ভালোই লাগলো। আর কবে দেখা হবে তাতো বলা যায় না। আমি শুধু হু শব্দটুকু উচ্চারণ করলাম। এরপর তারা দুজন আমার জিজ্ঞাসা নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছিল, সে-সব আমার কানে তেমন তরঙ্গপাত করছিল না কেবল এতটুকু শুনলাম ফোনে তাদের পরিচয় হয়েছিল, তারপর প্রেম। তিনি ফোনে গান গেয়ে তার মন জয় করেছিল এবং একসময় তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। হঠাৎ করেই রোদ পড়ে এলো, আমরা এতক্ষণ কেউ খেয়াল করিনি ভাদ্রের আকাশে প্রচণ্ড মেঘ। এক্ষুনি মেলা থেকে না বের হলে বৃষ্টিতে ভিজতে হতে পারে। আমাকে এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে, বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হলে তো আমার চলবে না। আমার বাম হাতের দাগ হয়ে যাওয়া পুরোনো ক্ষতাটার উপর আমার ডান হাত কখন যে আনমনে উঠে গেছিল বুঝতে পারিনি। আমি মুদু হেসে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ভালো থাকবেন, খুব খুশি হয়েছি আপনি আপনার মনের মতো মানুষ পেয়েছেন দেখে।
আমাদের দুজনার হয়তো আবার কোন এক শারদীয় মেলায় দেখা হবে।

*****************************