You are currently viewing দহন > রোকসানা সাথী

দহন > রোকসানা সাথী

দহন

  রোকসানা সাথী 

সংসারটা কবুতরের খোপের মতো হলেও কি হবে ; সিন্দাবাদের ভূতের আলিঙ্গন অত্যাচারের খড়গহস্ত তৃষ্ণার অপুষ্ট ঘাড়ে চেপে বসেছে। বাপ বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছেন তালোই সাহেবের দৌরাত্ম্যে। মা তাজমহল বেগমের জীবদ্দশায় বাবা তালোই বনে গেছেন। ভাই বনের পশুর চেয়েও অনেক বেশি হিংস্র, বন্য,নাদান। ভোরের কাক জাগার বহু আগেই মা দুর্গার দশভুজার পারঙ্গমতায় তৈরি হতে হয় তৃষ্ণাকে শীত- গ্রীষ্ম বারোমাসই। সাংসারিক স্টিমরোলারের বেশুমার বাষ্পীয় উত্তাপে, বাসে চড়ার ধকল পোহাতে, মোড়ের মুখে লুইচ্চা হীরার মুখোমুখি-চোখাচোখি হবার ভয়ে তৃষ্ণার নির্ভীক কলিজার ধড়ফড়ানি কয়েক টন বেড়ে যায়। যমদূতের মতো লাগে হারামিটাকে। নারী স্বাধীনতার পাছায় উষ্টা মারতে ইচ্ছে করে। নারী পুরুষের সমতার লড়াই, নারীর ক্ষমতায়নের বস্তাপচা প্যাচাল,ন্যায্য হিস্যা বুঝে পাওয়ার বক্তৃতায় গলাবাজি, লেকচার,সেমিনার, সিম্পোজিয়াম… ‘ যেই লাউ সেই কদু! ‘ দাতা সংস্থার ঘাড় মটকে বস্তা বস্তা ডলার রুজির ধান্ধাবাজিতে শকুনের লোলুপতায় উন্মত্ত সব বদমাশ হারামখোরের গুষ্টি। ধাপ্পাবাজ। বাটপারের নাতি পুতি।

লুইচ্চা হীরার পাতিলের তলার রঙের এবড়োখেবড়ো কর্দমাক্ত হায়েনামুখো চোরা দৃষ্টির উৎপাতে উষর হয়ে ওঠে তৃষ্ণার সকালটা অজানা আশঙ্কায় অজান্তেই। ঠাস ঠাস শব্দে দু’গালে থাপড়ায় নিজেকে মনে মনে। মুঠোফোনের হেডফোনের বোতাম দুটো দু’কানে তুলার পরিবর্তে ব্যবহার করে বেঁচে বর্তে ওঠে। ‘পিঠে বেঁধেছি কুলো,আর কানে দিয়েছি তুলো ‘- কথাটার যুক্তিযুক্ত প্রয়োগে তিরিক্ষি মেজাজেও চৈত্রের গুমধরা সকালে একপশলা বৃষ্টির তৃপ্তির সুরভিতে তৃষ্ণার মনের আনাচকানাচে ময়ূর পেখম মেলে ধরে। সাতসকালেই মধ্যদুপুরের ব্যস্ততা পথে। গিজগিজ করছে মানুষের মাথা মধ্যবাসাবোর সরু চল্টা ওঠা রাস্তাটা। মা-বাবার হাত ধরে স্কুলগামী ছেলেমেয়েরা দৌঁড়োচ্ছে। গার্মেন্টসে উধ্বর্শ্বাসে ছুটছে নানা বয়সী মানুষ। কারো হাতে শোভা পাচ্ছে মনোহর টিফিন ক্যারিয়ার। কারো বা সুদৃশ্য হটপট। চপলগতিতে ব্যস্ত পায়ে হেঁটে চলার ছন্দে আনন্দে নিমগ্ন উঁচুনিচু খানাখন্দে ভরা রাস্তাটা যৌবনবতীর লাস্যময়ী খুশিতে বাকবাকুম।

দেশটার যেন কোনো বাপ মা নেই। হুট কথাতেই তোড়জোড় উৎসবে কোমর বেঁধে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির রমরমা প্রজেক্ট চালু হয় চৈত্রের শুরুতেই। ঢিমেতালে কাজ গড়িয়ে বর্ষার মুখে চুমু খেতে পারলেই কেল্লা ফতে! বরাত খুলে যায় টেন্ডারবাজদের। ‘ নো চিন্তা, ডু ফুর্তির ‘ ভাবগাম্ভীর্যে ধুঁকে ধুঁকে এগিয়ে চলে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। ছোটোখাটো ব্যাপারে নজরদারি নেই উপরমহলের। একেই বলে হয়তো ‘কারো পৌষমাস, কারো সর্বনাশ! ‘ আমজনতার ভোগান্তির সীমা পরিসীমা চরমে ওঠে। পিছলা খেয়ে কারো ঠ্যাং ভাঙে, কারো কনুই, পায়ের নলি,কোমরের শিরদাঁড়া, কারো আবার পাছার হাড্ডি ভাঙে কাচের প্লেটের সশব্দ উল্লাসে! ট্যাক্স দেয়া আর ভোট দেয়া বেহাল অবস্থার শিকার দিশেহারা নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া ঘাম ঝরানো মেহনতির নাভিশ্বাস ওঠে। ‘বিধি হলো বাম’ নয়তো ‘ অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায় ‘ উদয়াস্ত খেটেপিটে এসে শান্তির ঘুমটাও ভাগ্যে জোটে না বিদ্যুতের ঘনঘন আনাগোনায়। ব্যাপারখানা এমন দাঁড়িয়েছে, ‘বিদ্যুৎ যায় না কালেভদ্রে আসে! ‘ গ্যাস নাই। বিদ্যুৎ নাই! পানির হাহাকার! চারপাশে শুধুই দীর্ঘশ্বাস! আর রোনাজারির আহাজারি! কী যে একটা হ য ব র ল অবস্থা…. কদম মেপে হাঁটতে শিখে গেছে এলাকাবাসী। একটু উন্মনা হলেই… অন্তহীন দৌঁড়ঝাপের ঠিকানা পঙ্গু হাসপাতালের নোংরা ন্যাংটা নোনাধরা বারান্দায় ঠ্যাং উঁচিয়ে শুয়ে থাকার দুর্ভাগ্যের হাহুতাশ! ইতোমধ্যে বিজ্ঞ বিশারদ হয়ে উঠেছে তৃষ্ণা বিবর্তনবাদের সূত্রের সংজ্ঞায় অভিযোজিত হতে। প্রতিদিন আপডেট হচ্ছে। নিরন্তর চলে লড়াই নিজের সাথে! লুইচ্চা হীরার কর্দমাক্ত অশুভদৃষ্টির বিরুদ্ধে চলে আপসহীন সংগ্রাম! ‘ঠেলার নাম বাবাজি ‘ না বলে বলতে বাধ্য হচ্ছে ‘ ঠেলার নাম চাচাজি ‘। চাচাজির বেশুমার রহমের ফরমানে এখনো তৃষ্ণাদের অস্তিত্ব কোনোমতে ঠিকে দেয়া আছে পরগাছার নির্লজ্জ তবিয়তে। দেয়ালে পিঠ ঠেকার উপক্রম মাসের মধ্যভাগেই। বেহায়া সংসারটা মুখ বুজে জোড়াতালি দিয়ে চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বালির বাঁধের মতো কবে না জানি ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে।

চারুকলা ইন্সটিটিউটের শেষ বর্ষের কৃতি শিক্ষার্থী হিসেবে সুখ্যাতি তৃষ্ণার, প্রিয়দর্শিনী জয়িতার সুনাম, কদর গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে।ক্যাম্পাসের যে কোনো আয়োজনে, উৎসবে খোঁজ পড়ে তৃষ্ণা – সজল যুগলের। স্বয়ং বিপ্লব বালা স্যার এই যুগলবন্দীর ওপর সিরিয়াস রকমের ভরসা রাখেন। বিজয়দিবসের উৎসবের আমেজের হিড়িক পড়ে নভেম্বরের মাঝামাঝিতেই। চারুকলার ছেলেমেয়েদের নাওয়া খাওয়ারও ফুরসত মেলে না। পয়লা ফাল্গুন,বসন্ত উৎসব, জাতীয় কবিতা উৎসবের সরগরম আয়োজন, ভালোবাসা দিবস, মহান একুশের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান- বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যস্ত দিনরাত্রি কাটে। বিশেষত পহেলা বৈশাখ নিয়ে বিয়ে বাড়ির হুল্লোড় টাইপের সুবাসিত গুঞ্জরণের আনন্দের রঙিন ধুম গোটা ক্যাম্পাসে। আর মাত্র ক’টা দিন! বিশাল কর্মযজ্ঞ সাফসুতরো করতে হবে বিশাল চত্বর। চৈত্রের শুরুতেই হাতে কলমে মাঠ পর্যায়ে কাজে কব্জি ডোবায় ছেলেমেয়েরা। অগত্যা কাকভোরে প্রতিদিনই বেরোয় তৃষ্ণা। ফিরতে ফিরতে সাতসন্ধ্যে গড়িয়ে রাত ছোঁয়। রাতের অন্ধকারের চাইতেও বেশি ভয় ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে, ঘৃণায় মরে যেতে ইচ্ছে করে হীরার লোভী শিয়ালের টুসটুসে লোলুপ বর্শামুখো চোখ দুটোকে।সাঙ্গপাঙ্গ সহযোগে অধীর প্রতীক্ষার প্রহর গুনে তৃষ্ণা না ফেরা পর্যন্ত। হঠাৎ করেই বেশ মজাই পায় এই ভেবে… বেটাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তৃষ্ণার দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে। অনভিপ্রেত ঝুটঝামেলা এড়ানো যেতো যদি হোস্টেলে থাকা যেতো। নিয়তির কাছে যে হাত পা বাঁধা! শয্যাশায়ী মায়ের করুণ অসহায় দৃষ্টির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হতেই হয়। তাইতো মুখ বুঁজে সমাজের নোংরা ঘাতক ব্যাধির কাছে নত হতে হয়। ভোররাতেই ভাত,ডাল,তরকারি করে নেয়। দু পাতিল খাবার পানিও ফুটিয়ে রাখে।শুক্কুরি সারাদিন মায়ের সঙ্গী। তদারকি করে।শাড়ি কেঁচে দেয়।চুলে লক্ষীবিলাস তেল মেখে বেনী গাঁথে। নিঃসঙ্গ মায়ের একাকীত্ব মোচনের সহচরী বনে গেছে বহুদিন। ঝক্কি ঝামেলার সাগর পাড়ি দিয়ে প্রচন্ড ক্লান্ত পরিশ্রান্ত তৃষ্ণা বাড়ি ফেরে। কার্নিশের পোয়াতি বেড়ালটার মতোন একটুও নড়তে চড়তে জানে কুলোয় না। সকাল সাতটার ঘন্টা পেরোনোর আগেই গ্যাসের উত্তাপ নিভু নিভু আঁচের মন্থর গতিতে ম্রিয়মাণ হতে থাকে। রান্না তো দূরের কথা এককাপ চা বানানোও অকল্পনীয়। ঘরকন্নার কাজ শুরু করে মধ্য বাসাবোর লোকজন ভোররাতেই।বিপন্ন অমানবিক জীবনধারণের গতিময়তায় অভ্যস্ত হতে শেখে তৃষ্ণাও। সারা রাতে চোর- পুলিশ খেলার অবকাশে শেষরাতের দিকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে থিতু হয়ে ঝিমোয়, সারাদিনের দুরন্তপনায় হয়তো একটুও জিরানোর সুযোগ মেলে না বিদ্যুৎ বেচারার! সেই সন্ধিলগ্নেই পরম আরামের ঘুমকে হারাম করে ঘুমজর্জর ঢুলুনি চোখ কচলিয়ে তেল – পেঁয়াজের ঝাঁঝালো কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডায়াবেটিসসহ কুটিল হিংসুটে থাইরয়েডের সাথে সখ্য গড়ে তুলেন মা তাজমহল বেগম। গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো স্নানঘরে পা পিছলে আলুরদম হয়ে গেছে কোমরের হাড্ডি! দুঃসহ বিপন্নতার ঘেরাটোপে বন্দী দুর্দিনে বাড়িওয়ালা চাচাজি আলফাজ তরফদার দরাজ হাতে এগিয়ে এসেছেন। মুখ ও মুখোশ একাকার হয়ে যায় চাচাজির। সজল’কে দেখা মাত্রই চাচাজির মুখোশ উন্মোচন হতে থাকে ক্রুর আক্রোশে। হাসপাতালে মা’কে নিয়ে যেতে সজল চলে আসে সাতসকালে । প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে সজল’কে। ইঁদুর ধরার উসিলায় চাচাজি বেড়ালের মুখোশ পরিধান করে এলোপাতাড়ি ঘুরপাক খায় দরজার বাইরে। দোয়া কলেমা ঝরে পড়ে সুমধুর কন্ঠের প্রকোষ্ঠ হতে। দিল গলানোর প্রাগৈতিহাসিক কলকাঠি মুখস্থ চাচাজির। ‘দুধ দেয় যেই গরু তার লাত্থিও মিষ্টি’ বাবারূপী তালোই সাহেব একদিনও আসেনি বিগত যৌবনা অসুস্থ স্ত্রীর খোঁজখবর নিতে। মধুপায়ী তালোই সাহেব মধুবন্তী হুরপরী নিয়ে মশগুল! ভূত-পেত্নী মনে ধরবে ক্যানো?

‘কিছু পেতে হলে বড়ো কিছু বিসর্জন দিতে হয় ‘…. কথাটি সম্ভবত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টি রাজলক্ষ্মীর। ‘ গিভ এন্ড টেক’ এর আবহ এ সংসারে খাপ খাইয়ে নিয়েছে বহুকাল ধরেই। ‘নিচচুবা বিলাই কাটা খাওনের যম ‘ সেঁধিয়ে যেতে চায় তৃষ্ণার গহিনের অন্তরঙ্গে। তৃষ্ণার নরোম কবোষ্ণ পালতোলা বুক ও নিতম্বের আশেপাশে ক্ষুধার্ত বিড়ালের নিবিড়তায় জ্বলজ্বল করে ফরফরাসের লোলুপ দু’চোখ। অমানুষ ভাইটা জানোয়ারের চেয়েও হিংস্র। উদগ্র থাবায় ফালাফালা করে অসহায় মা’কে, বোন’কে। মায়ের জীবদ্দশায় বাপ তালোই আর ভাই বনের পশু বনে গেছে। অসহায়ত্বের পুরোদস্তুর সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নেয় বাড়িওয়ালা চাচাজি। লেবাসধারী ইবলিশ! মুখ থেকে মুখোশটা ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে তৃষ্ণার। বাপকে চিড়িয়াখানার সিংহের খাঁচায় বন্দী দেখতে ইচ্ছে করে। ইতর ভাইটিকে বাঘের খাঁচায় তালা আটকে রাখতে ইচ্ছে করে। লুইচ্চা হীরার পাছার হাড্ডি ভেঙে নুন আর শুঁকনো মরিচ গুড়ো ভরে দিতে পারলে জনমের তরে শান্তি পেতো তৃষ্ণা। একেই বলে ভাগ্য! প্রায়শই ইচ্ছে করে সিলিং ফ্যানের রডটায় ওড়না পেচিয়ে লটকে পড়ে। নিজের পাথরচাপা ডানাভাঙা সত্তার কাছে হরদম পরাস্ত হতে হতে ভঙ্গুর হতে থাকে বেঁচে থাকার আমোদিত সুখস্বপ্ন! সজলের সুরভিত স্পর্শে আপ্লুত তৃষ্ণা বেঁচে থাকার প্রাণপণ সংগ্রাম চালায়। লড়াই চলে নিরন্তর নিজের সাথে নিজের। বিলাইমুখো চাচাজির মুখোশ খুলে দিতে ইচ্ছে করে। সংসার টিকিয়ে রাখার চোরাগলির কালো অধ্যায়ের বিপন্ন হার্মাদ নীলচিত্রগুলোকে কীভাবে উন্মোচন করবে সজলের কাছে! তবে কি মেয়ে হয়ে জন্মানোটাই পাপ! নাকি ঘোরতর অপরাধ? অপ্রতিরোধ্য দহনের দুর্বার আন্দোলনে বুকের ভেতরে সমুদ্রের বিরাটাকার ঢেউয়ের তুমুল লড়াইয়ে নেতিয়ে পড়া তৃষ্ণা রাজহাঁসের স্বচ্ছ সফেন বিহ্বলতায় সোচ্চার হয়ে ওঠে। ঘুরে দাঁড়ায়।কেনো ঘাতক হবে? অনেকতো দহন হলো। দহনের বৃত্ত পেরিয়ে ভালোবাসার আঁচলে গহিন অরণ্যে মুক্তির নবদিশা মেলে! রাতঘুমে কোনোদিন স্বপ্ন না দেখা তৃষ্ণা দু’চোখ পেতে,দু’হাত বাড়িয়ে দেয় শীতলপাটি বিছানো তেপান্তরের স্বপ্নরাজ্যে। (পরিমার্জিত)