You are currently viewing গদ্যের সংসার ও সমালোচনা সাহিত্য || তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী

গদ্যের সংসার ও সমালোচনা সাহিত্য || তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী

গদ্যের সংসার ও সমালোচনা সাহিত্য

তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী

বাংলা সাহিত্যে গদ্যের সংযোজন অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে। উনবিংশ শতকের পূর্বে বাংলা সাহিত্য ছিল পদ্যআচ্ছন্ন। পূর্বে কিছু কিছু সরকারি চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজে, কড়চা লিখা হতো মাত্র গদ্যে। এভাবে এই উপমহাদেশে শুরুতে রাষ্ট্রীয় কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য গদ্য ভাষা ব্যবহৃত হলেও পরে তা বহুমাত্রিকতা লাভ করে। একসময় পর্তুগীজ পাদ্রী ও খ্রীষ্টান মিশনারির হাত ধরে ধর্ম প্রচার এবং পরে শাসকদের প্রশাসন পরিচালনার সুবিধার্থে যে গদ্যের আমাদের ভাষার সংসারে অনাহুত প্রবেশ ঘটেছিলো, তা আজ সময়ের প্রয়োজনে খোলস পাল্টিয়ে নব পুষ্প-পল্লবে নবরুপে বিকশিত।

শুরুতে রাষ্ট্রীয় কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য গদ্য ভাষা ব্যবহৃত হলেও পরে তা বহুমাত্রিকতা লাভ করে। ইংরেজদের নিজেদের গরজে তৈরি গদ্যকে আজ আমরা নিজেদের মতো করে নিয়েছি। নানা মনীষীর কলম ছুঁয়ে গদ্য আজ মার্জিত, নিজস্ব স্বর চিহ্নিত। সাধু গদ্যের সাথে তৈরি হলো চলিত গদ্য। তৈরি হলো লেখকদের নিজস্ব কন্ঠস্বর, ভাষাভঙ্গি, ভাষাশৈলীও। লেখকদের এই স্বকীয় গদ্যভঙ্গিই চিনিয়ে দেয় লেখককে। গদ্য বা প্রবন্ধ এখন রসকষহীন বিষয় নয়। এতে এখন গতি বা প্রবহমানতা আছে, আছে দেহে লাবণ্যের মতো অন্তলগ্ন ছন্দ, আছে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তরঙ্গের নাচন, বিষয়ের ধারাবাহিকতার কূল পর্যন্ত এসে উপচে পড়া, দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা। গদ্যের গতি বা প্রবহমানতাসমৃদ্ধ ছন্দ একেক লেখকের হাতে একেক রকমভাবে উদ্ভাসিত হয়।নিজস্ব তাড়নায় তারা নিজেরাই নির্মাণ করে নেন তাদের নিজস্ব ছন্দ। গদ্য পাঠকেরা টানা পড়তে পারেন, তবে একটানা নয় ; তাকে অর্থোদ্বার করতে হয়, আর সেজন্য বারবার বিরাম চিহ্ন ধরে থামতে হয়। গদ্য স্রেফ কোনো কাহিনিনির্মাণ নয়; এটা আসলে ভাব, চিন্তা ও রসের এক ব্যঞ্জনাময় ও শিল্পিত প্রকাশ। এক্ষেত্রে একজন গদ্যকার বা প্রবন্ধকারকে যথেষ্ট সর্তকতার সাথে এগুতে হয়, সীমানাচ্যুত হলে তা আর বিশুদ্ধ থাকে না। তবে এতে তুলনামূলকভাবে সৃজনশীলতার চাইতে স্বাধীনতা বেশি। এতে নিজের চিন্তা ও উপলব্ধির কথা বলা যায়। অভিজ্ঞতার ব্যবহার চলে, মানটাও থাকে নিজস্ব।

গদ্যের সংসারে প্রবন্ধতো রয়েছেই ; এর বাইরে আত্মজীবনী, ভ্রমণ গদ্য, রম্য রচনা, নাটক, সমালোচনা সাহিত্য, ভাষণ- প্রহসন ইত্যাদি অনেক সাহিত্যের প্রকরণও একীভূত। তবে সমালোচনা সাহিত্য এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ববহ।

সমালোচনা সাহিত্য সাহিত্যের যথার্থতা যাচাইয়ের একটি চলমান প্রক্রিয়া । সাহিত্যের বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনে সমালোচনার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সাহিত্যের প্রতি মানুষের কৌতুহল থেকেই এ ধরণের সাহিত্য বিচারের বিচিত্র রুপ ও পদ্ধতির অনুসন্ধান ও উদ্ভব হয়েছে। সমালোচনার কাজ সাহিত্যের নিয়ম- শৃঙ্খলার দিকে লেখককে মনোযোগী করা। একজন লেখক সাহিত্যে সৃজন- মননের মাধ্যমে কতোটা আলোর নাচন সৃষ্টি করতে পেরেছেন তা সাহিত্য সমালোচনায় উঠে আসে। সাহিত্যে লেখকের মানস দৃষ্টি, রচনার ভাব, বস্তু, রুপ, রস, অলন্কার, সৌন্দর্য কতটুকু রক্ষিত হয়েছে, লেখকের স্খলন কতটুকু হয়েছে, তার পথ- নির্দেশনা ও সতর্কতা থাকে সমালোচনা সাহিত্যে।

লেখকের সাথে পাঠকের মেলবন্ধন ঘটাতে সমালোচনা সাহিত্য অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। লেখকের মনোজগতকে অধ্যয়ন করতে না পারলে সাহিত্যের যথার্থ বিচার করা যায় না। সাহিত্য সমালোচনা তখনই সম্ভব, যখন সাহিত্যিকের নিজের কল্পনা আবেগহীনভাবে পাঠকের কল্পনায় সঞ্চালিত হয়। অর্থাৎ যখন কোন সাহিত্যিকের দেখা – শোনা পাঠকের ‘দর্শনে’ ও ‘শ্রবণে’
রুপান্তিত হয়, তখনই ঐ সাহিত্যিকের সাহিত্য সমালোচনা যথাযথ ও স্বচ্ছ হয়। অন্যথায় চিন্তাগত স্ববিরোধিতায় তা একপেশে অথবা অবমূল্যায়িত হয়।

সমালোচনার সময় লেখার ব্যাখ্যা (Interpretation), বিচার- বিশ্লেষণ (Judgement) ও রস- আস্বাদন (appreciation) অত্যাবশ্যক।একমাত্র অন্তর্দৃষ্টি, কল্পনা শক্তি ও সহৃদয়তার মাধ্যমে তা সম্ভব। শার্ল বোদলেয়ারের মতে, ‘……. একজন কবির মধ্যে যদি একজন সমালোচক জেগে না থাকে সেটা আরো আশ্চর্যের ‘। আমাদের দেশে কিছু কিছু সাহিত্য- সমালোচক কোন বিষয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকটা অহংয়ের সাথে রায় দিয়ে বসেন। এটা যেন,’ গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ ধরণের কর্মকাণ্ড। আসলে এ ধরনের রায় দেওয়ার জন্য তো তাকে কেউ বিচারক নিয়োগ করেন নি। সমালোচনা করার সময় মূল শিল্প আত্মস্থ করতে হয়। আসলে সব সমালোচনাই মূলের ব্যাখ্যা, মূলকে পাঠকের সম্মুখে খোলাসা করা, স্পষ্ট করায় নিবেদিত থাকে। এজন্য বর্ণিত বিষয়ে নিজের পুঁজি দিয়ে সুস্হির, আত্মবিশ্বাসের সাথে সমালোচককে এগুতে হয়। আর তখনই সত্যিকার সমালোচনা হয়, যা গ্রহন করে লেখক সমৃদ্ধ হন এবং লেখায় আলোর স্ফূরণ ঘটে।

কোন সাহিত্যই মহৎ সাহিত্য হয় না, যদি তার ভিতরে কোনো গভীরতা না থাকে। এই গভীরতা আসে লেখকের দার্শনিকতা থেকে। দার্শনিকতার কারণেই সাহিত্যে বক্তব্য আসে। অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, লেখক যা বলতে চাইছেন, তার লেখা তা বলছে না। ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব প্রবহমান। এই দ্বন্দ্ব লেখাকে প্রাণবন্ত করলেও এক্ষেত্রে সাহিত্য সমালোচকের অনেক বলার থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সাহিত্য সমালোচনার ধারাটি তেমন বিস্তৃত বা বিকশিত হয় নি। যদিও সমাজে বস্তুগত উন্নতি ঘটছে, এই উন্নতি ভোগবাদী মানসিকতার। এটি শুধু মুনাফা চেনে, সংবেদনশীলতা বোঝে না। বর্তমানে সাহিত্যের পঠন-পাঠনের দৈন্যতায় সমালোচনা সাহিত্য প্রাণবন্ত নয়।

===========================

লেখকঃ প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কবি।

===========================