You are currently viewing আমিনুল ইসলামের কবিতায় সময়ের চিত্রকল্প, সমাজ বাস্তবতা> নুসরাত সুলতানা 

আমিনুল ইসলামের কবিতায় সময়ের চিত্রকল্প, সমাজ বাস্তবতা> নুসরাত সুলতানা 

আমিনুল ইসলামের কবিতায় সময়ের চিত্রকল্প, সমাজ বাস্তবতা
নুসরাত সুলতানা 
সময়ের চিত্রকল্প, সমাজ বাস্তবতাকে প্রবলভাবে ধারণ করে আমিনুল ইসলামের কবিতা হয়ে উঠেছে সর্বকালের এবং সার্বজনীন।
“জাতিসংঘ – সমকামিতায় আসক্ত হয়ে ভুগছে ধাতুদুর্বলতায়!”
এই লাইনটি দিয়েই পাঠক স্পষ্টতই বুঝে যান কবির মননের বিচরণ ক্ষেত্র এবং কবিতার দর্শন ও চিত্রকল্প। কবি আমিনুল ইসলাম কবিতা লিখছেন নব্বইয়ের দশক থেকে। একুশ শতকে যখন আমাদের সিঁথানে বিশ্বায়ন আর পৈথানে পুঁজিবাদ তখন কবির কবিতা খুব সহজাত ভাবেই হয়ে উঠেছে সময়ের সঙ্কটের ধারক এবং বাহক। কবি আমিনুল ইসলাম শুধুই শিল্প, সৌন্দর্যের সাধনায় নিজের কাব্য ভাবনাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি প্রতিনিয়ত কবিতাকে ব্যপ্ত করে গেছেন মানুষের সমকালীন দুঃখ, কষ্ট এবং অস্তিত্বের সঙ্কটে। কবি স্পষ্টতই হয়ে উঠেছেন তৃতীয় বিশ্বের মানুষের আত্মার আত্মীয়। যেন মানুষের দুঃখ এবং অস্তিত্বের সঙ্কটকে কবি উপলব্ধি করেছেন হৃদয়জাত পরম মমতায়। কবির নিজের উক্তিতেই আমরা পাই-
মানুষের পক্ষে আমি এক কবি
জোটহীন ভোটহীন
—–
হে হিংস্র সভ্যতা,
 আমি তোমার বিনাশ কামনা করছি।
মানুষের জীবন যেমন সমকালীন, তেমনি চিরকালীন ও অবশ্যই। মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন- আশা, সবকিছু চিরকালীন। আধুনিক সময়ে বাস করেও মানুষের হাসির শব্দ, কান্নার গোঙানি, খুশিতে চোখের দ্যুতি সব আবাহমান কাল ধরে শ্বাশত। তাই কবিতাকে যেমন সময়ের চিত্রকল্পকে ধারণ করতে পারতে হয় তেমনি হয়ে উঠতে হয় চিরকালীন। যা মানুষের কাঙ্ক্ষিত মুক্তির কথা বলে, ফসলের স্বপ্নের কথা বলে, প্রেম আর ভালোবাসার কথা বলে। এই চিরকালীন অভিধায় আমিনুল ইসলামের কবিতা চিরকালীন, সার্বজনীন। দেখুন সুপ্রিয় পাঠক, কবির দৃপ্ত উচ্চারণ – “জাত প্রেমিক নিয়মের দাস হয় না!
হয় না কোনো ধ্বংসের বাহন।”
প্রতিটি সময়ের বুকের গভীরে থাকে একটা দীর্ঘশ্বাস, চোখে থাকে লুকানো চোরা বিষন্নতা।  যা সৃষ্টিশীল মানুষের দৃষ্টিকে এড়িয়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে কবি  মানুষ,প্রকৃতি আর সময়কে পাঠ করে হয়ে ওঠেন
ত্রিকালদর্শী। যখন প্রযুক্তিবিদরা সভ্যতার উৎকর্ষতায় তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন, কবি দেখতে পান প্রজন্মের চোখে অকাল চশমা, সবুজের হলুদ ব্যাধি, মায়ের আঁচল চাবির গোছহীন। কবি আমিনুল ইসলাম যখন বলেন- সভ্যতার পুনর্নির্মাণে সভ্যতার ধ্বংস জরুরি। আমরা গভীর ভাবনায় নিপতিত হই। এমনভাবেই কবিতায় তিনি গেঁথে দিয়েছেন সময়ের দর্শন।
কবি – সাহিত্যিকরা মূলত প্রজন্মের পথ প্রদর্শক। মানুষের বোধ বা উপলব্ধির বিনির্মানই তাঁদের আরাধনা। যখন সমাজিক অবকাঠামো চুরচুর করে ভেঙে যাচ্ছে, শিক্ষা ব্যবস্থা চরম সঙ্কটাপন্ন তখন কবির কলম হয়ে ওঠে এই অচলাবস্থা ভাঙার কুঠার। এই অভিধায়ও আমিনুল ইসলাম একজন অনন্য এবং অনিবার্য কবি। কবির পঙক্তিতে– আঁধারই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়!
আমাদের জন্য অন্যকোনো পাঠশালা নেই;
দ্যাখো রাজনীতির গায়ে আজ দুর্গন্ধের ছত্রাক!
মানুষের রাষ্ট্র মানে– বারুদের পাহারায় ডলারের মাতবরি।
কবিতার উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং শিল্পরূপ বিচারে আমিনুল ইসলামের কবিতা অনন্য উৎকর্ষতায় উত্তীর্ণ।  তিনি কবিতায় খুব নিবিড়ভাবে উঠিয়ে এনেছেন জীবনবোধ। জীবনবোধের বিনির্মানে তিনি প্রকৃতিকে পাঠ করেছেন ধ্যানমগ্ন হয়ে। তাই আমিনুল  ইসলামের কবিতার রসবোধ অসাধারণ।
“নীরবতার গা ছুঁয়ে ভেসে আসে হাওয়া
সে হাওয়ায় ভেসে আসে ঘ্রাণ ;
এমন রাতে কে ঘুমায় নাক ডেকে?”
কবি আমিনুল ইসলাম একইসাথে আধুনিক এবং চিরকালীন কবি। তাঁর শব্দচয়ন, আঙ্গিক বিনির্মান এবং উপস্থাপন যেমন আধুনিক তেমনি তার আবেদন শ্বাশত, আবাহমান। কবির পঙক্তি —
“শৈশবের মতো হারিয়ে ফেলছি
সুরেলা হাওয়ায় মাঠ
মহাকালের মিউজিয়ামে জমা হয়েছে
রাখালিয়া বাঁশি”
কবি আমিনুল ইসলাম বহুল পঠিত হবেন, হয়ে উঠবেন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর এবং অনাগত কবিদের পথ প্রদর্শক এমনটাই প্রত্যাশা একজন নিবিড় পাঠক হিসেবে।
****************************
নুসরাত সুলতানা
কবি ও কথাসাহিত্যিক
****************************